পাঠকের ডায়েরীঃ একজন আরজ আলী

আরজ আলী মাতুব্বরের গল্প আমি প্রথম শুনি এক ঈদের দিন সকালে, ক্যাম্পাসে আংকেলদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের এক জটলায়। ঈদের দিন সকালে একদল মধ্যবয়স্ক মানুষের মাঝে এক কৃষকের গল্প সেরকম মজার কোন বিষয় হওয়ার কথা না কিন্তু তারপরেও আমি দাড়িয়ে দাড়িয়ে শুনে যাই সেই গল্প। কারণ সেটা ছিল আসলে এক অন্যরকম গল্প, সমাজের সাধারণ স্তর থেকে উঠে আসা এক সত্য অনুসন্ধানী মানুষের জ্ঞান পিপাসার বিচিত্র সব গল্প। যে কারণে অনেক আগে শোনা আরজ আলী মাতুব্বরের গল্পের দাগ আজও আমার মনে রয়ে গেছে। পাঠক সমাবেশ থেকে বের হওয়া হাসনাত আবদুল হাইয়ের ১০০ টাকা দামের উপন্যাস “একজন আরজ আলী” কিনতে হয়ত তাই আমাকে দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে হয় নি।

লেখক হাসনাত আবদুল হাই এই উপন্যাস লেখার জন্য কোন সরল রৈখিক বর্ণনা পদ্ধতি বেছে নেন নি। তাই উপন্যাসে কখনও আরজ আলী মাতুব্বরের সাথে তার ঘনিষ্ঠজনদের সংলাপ আবার কখনও লেখকের সাথে উপন্যাসের মাল-মশলা সংগ্রহকালীন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কথোপকথন কাহিনীর বিস্তার ঘটায়। লেখক মাঝে মাঝে আরজ আলী মাতুব্বরের ঘনিষ্ঠজন শামসুল হক বা আলী নূরের সাথে কথোপকথনের মাধ্যমে, তাদের নিজস্ব বিশ্লেষণ ব্যবহার করে ব্যক্তি আরজ আলী, সত্য অনুসন্ধানে তার সংগ্রাম তুলে আনেন। কখনও বা উপন্যাসে বরিশালের লামচরি গ্রামের কৃ্ষক আরজ আলী মাতুব্বর নিস্পৃহ ভঙ্গীতে বলে যান তার যত সব কথা।

এই উপন্যাসের পর্দা উঠে এক মন্ব্ঞ নাটকের দর্শক সারিতে। গ্যলিলিও নামে সেই নাটকের প্রধান চরিত্র গ্যলিলিও কে দেখিয়ে আলী নূর লেখককে সর্বপ্রথম আরজ আলী সম্পর্কে ইঙ্গিত দেন। কিন্তু লেখকের সাথে সাথে আমরাও খেই হারিয়ে ফেলি, কোথায় ফ্রোরেন্সের সেই গ্যলিলিও আর কোথায় বরিশালের লামচরি গ্রামের আরজ আলী মাতুব্বর। কিন্তু উপন্যাসের বিস্তারে লেখকের সাথে সাথে আমরাও বুঝে যাই তাদের মাঝে হয়ত কয়েক শতাব্দী পার্থক্য থাকতে পারে তবে গ্যলিলিও কিংবা আরজ আলীদের জন্য বাস্তবতার পরিবর্তন হয় নি। জ্ঞান চর্চার কারণে তাদের উভয়কে প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় বাধার মুখে পড়তে হয়েছে আর সুকৌশলে দুই জনই সেই বাধা কাটিয়ে উঠেছেন।

এই উপন্যাস পড়তে গেলে আপনার যে কথা প্রথমে মনে আসবে তা হল এটা আসলে এক আশাবাদী মানুষের জ্ঞান পিপাসার গল্প। তার দুলাভাইয়ের কাছে মার খাওয়া, মায়ের মৃত্যুর পর সমাজপতিদের ফতোয়া কিংবা কমিউনিস্ট সন্দেহে পুলিশের অত্যাচার কিছুই তাকে দমিয়ে রাখতে পারে নি। বরং এরকম প্রতিটি প্রতিবন্ধকতা কে তিনি দেখেছেন জীবনের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে যা কিনা তাকে তার লক্ষ্যে আর অবিচল করেছে। আর তাই কিশোর আরজ আলীর সাথে ঘরের মাচায় পুরান বইয়ের বস্তা আবিষ্কার করে আমরা উল্লাসিত হই, বইয়ের খোঁজে বরিশাল শহরের লাইব্রেরী থেকে লাইব্রেরীতে তাঁর পদচারণা আমাদের মুগ্ধ করে। ঋনের দায়ে বাস্তুভিটা হারান এক কিশোর কিভাবে উঠে দাঁড়ায়, একসময় জমি জিরাতের মালিক এক সচ্ছল মানুষে পরিণত হয় সেইসব ব্যক্তিগত গল্প আমাদের চমকৃৎ করে। উপন্যাসে এই মানুষটা যখন লাইব্রেরী কে স্কুল কলেজের উপর স্থান দেন তখন আমরা বুঝে যাই প্রথাগত ব্যবস্থায় ক্লাস টু পাশ এই মানুষটার জ্ঞানের উৎস কোথায়,দর্শনের ভিত্তি কি। কোন প্রকাশক যখন তার বই ছাপানোর মত সাহস দেখান না তখন নিজের উদ্যোগে বই ছাপিয়ে, গোপনে তা বিলি করে দেখান সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তিনি কত অবিচল। কিন্তু এই মানুষটাই আবার একসময় ঝড়ে তার নিজ সংগ্রহের সব বই হারিয়ে শিশুর মত কান্নায় ভেঙ্গে পরেন।

সমকালীন বড় মাপের ব্যক্তিত্বদের নিয়ে উপন্যাস রচনা একটূ দূরহ কাজ। কারণ একই সময়ে বাস্তবে বর্তমান লেখককে উপন্যাসের মূল চরিত্র সম্পর্কে আবেগের উর্ধ্ধে উঠে কলেমের ফ্রেমে তাকে বাধতে হয়। এখানে লেখকের ঘটনার পরম্পরা ও সত্যতা যেমন রক্ষা করতে হয় তেমন করে উপন্যাসে লেখকের প্রধান অস্ত্র কল্পনা শক্তির রাশ টেনে ধরে বর্তমানের সাথে খাপ খাওয়াতে হয়। আর একজন পরিচিত বড় মাপের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে সাধারণ পাঠকের মনে পূর্বানুমিত ছবি থেকে যায় যার সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করাও অনেক সময় লেখকের পক্ষে দূরহ হয়ে উঠে। আর হয়ত সেই কারণে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এ উপন্যাস সম্পর্কে বলেছেন- সাহিত্যে এন্টি হিরোদের যুগে বড় মাপের ব্যক্তিত্ব কে নিয়ে করা একটি ব্যতিক্রম ধর্মী সাহসী কাজ।

উপন্যাস হিসেবে “একজন আরজ আলী” হয়ত কালোত্তীর্ণ কোন কীর্তি নয় কিন্তু এর প্রধান চরিত্র আরজ আলী মাতুব্বরের জীবনের চমকপ্রদ ঘটনা প্রবাহ পাঠকে টেনে নিয়ে যেতে সক্ষম, এর সহজ সরল গদ্য পাঠকের মনযোগ ধরে রাখে। আর তাই আরজ আলী মাতুব্বরের মত বড় মাপের ব্যক্তিত্বের জীবনের এক সহজ পাঠ হতে পারে এই উপন্যাস।

Advertisements

2 thoughts on “পাঠকের ডায়েরীঃ একজন আরজ আলী

  1. আরজ আলী মাতব্বরের লেখা একটা বই পড়েছিলাম।কিছু মনে করবেন না,বইটি পড়ে আমার কিন্তু মনে হয়েছে উনি একটু বাড়াবাড়ি রকমের জ্ঞানী।যেরকম জ্ঞানের জন্য ফেরেশতা শয়তানে পরিণত হয়েছে।

    • ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য। আসলে এই লেখাটা লেখা হয়েছে আরজ আলী মাতুব্বরের উপর লেখা একটা বইয়ের উপর এবং সেই অনুযায়ী আমি এই লেখায় আরজ আলী মাতুব্বর কে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি 🙂

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s