আমার কাল অক্ষরের নায়িকারা

০।
আপনি প্রথম কখন প্রেমে পড়েছিলেন? আমি কিন্তু পড়েছিলাম অনেক ছোট থাকতেই, এই ধরুন গিয়ে ক্লাস ফোর। বয়সটা অবশ্য তখন বেজায় ছোট কিন্তু তাতে কী। মন তো আর তাতে বসে থাকে না। শান্ত শিষ্ট আমাকে বালিকারা বরাবরই ভাল পায় না কিন্তু তাতে কী মন তো তাও পাত্তা দেয় না। তাই অনেক আগে ক্লাস ফোরে, ১৯৯৬ সালের কোন এক সকাল অথবা বিকাল বা দুপুর কিংবা রাতের বেলায় আমি প্রেমে পড়ে গেলাম। গল্প উপন্যাসে মানুষ যেমন না বুঝে প্রেমে পড়ে ঠিক সেই ভাবে হঠাৎ করে প্রেমে পড়ে গেলাম এক বালিকার।

০১।
ব্যাপারটা অবশ্য তখন ঠিক করে বুঝে উঠতে পারি নি। বুঝেছি আর অনেক বছর পরে, অনেক বড় হয়ে। তবে আমার এই প্রথম প্রেম ছিল না কোন রক্ত মাংসের মানবী বরং ছিল এক মায়াময় বালিকা, ছাপার কাল অক্ষরে শুধু যার অস্তিত। তখন মনে হত চশমার আড়ালে তার শান্ত দুইটি চোখ শুধু চেয়ে থাকে আমার দিকে। তখন তো আর এত কিছু বুঝতাম না, মনটা খালি কেমন জানি খালি খালি লাগত। আর মন খালি খালি লাগলেই চলে যেতাম বাসার সামনের লাইব্রেরীতে। তাক থেকে নামিয়ে চুপচাপ পড়তাম নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড়। পুরা বইটা তো অনেকবার পড়া তাই সব পড়তাম না, পড়তাম শুধু অল্প কিছু অংশ। যেখানে শুধু বলা আছে চশমা পড়া শান্ত চোখের মেয়েটার কথা, ললি। বোকা আমি মলাটের যার ছবির দিকে তাকিয়ে শুধু ভাবতাম এ মেয়ে বুঝি খালি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিংবা পাথারিয়ার খনি রহস্য, যেইখানেও সেই পুরাতন চশমা পড়া ললি। এইভাবেই এই মেয়েটা প্রথম আমাকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল সেই বয়সে, পাথারিয়ার খনি রহস্য কিংবা নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড়ে। ধন্যবাদ শাহারিয়ার কবীর, আমার কৈশরে এমন চমৎকার এক কল্পনার বালিকা কে উপহার দেওয়ার জন্য।

০২।
এর পরের হোঁচট খাওয়া বেশ অনেকদিন পর, ক্লাস নাইনে। হাউজ লাইব্রেরী আর কলেজ লাইব্রেরীর তাবৎ বই শেষ করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে তখন শুধু পড়ি। রাতে প্রেপ্রে, দিনে ক্লাসে, গেমস আর পিটির ফাকে। আসলে যখন সময় পাই তখন। আর সারা দিন রাত বই পড়ার সেই সময়ে আমার সংগী তখন রোকন। ঠিক সেই রকম একটা তালমাতাল সময়ে আমাদের নজর পড়ে বিভূতিভূষণের দিকে। বাংলা ক্লাসিকের কোন প্রবাদ পুরুষ সেই প্রথম আমাকে নাড়িয়ে গেল, শুধু আমাকেও নয় সম্ভবত রোকন কে। তাই আমরা একসাথে বই পড়ি, পাশাপাশি একি পাতা খুলে। ইছামতী দিয়ে শুরু তারপর আরণ্যক হয়ে অপারাজিততে আমাদের আগমন এবং সেইখানেই আমার জীবনের দ্বিতীয় হোঁচট।  আমার জীবনের পড়া সম্ভবত সেরা রোমান্টিক সিন হচ্ছে অপুর বিয়ের দৃশ্য। চাল চুলোহীন সুপুরুষ অপুর কে ঘুম থেকে তুলে বন্ধু বলল- অপু তুই আমাদের বাঁচা। আর তাতেই অপু জড়িয়ে গেল অপর্ণার সাথে, কিছু বুঝে উঠার আগেই জড়িয়ে গেল রক্ত মাংসের এক মানবীর সাথে। আর সেই দৃশ্য যেন আমায় প্রেমে ফেল দিল অপর্ণার। আমার অসম্ভব প্রিয় চরিত্র অপুকে সম্ভবত এই এক জায়গায় আমি হিংসা করলাম কারণ ওর কাছে অপর্ণা আছে, অপুর নিজের কাছেও যাকে রহস্য মনে হয়। তাই আমার অপুকে দারুণ হিংসা কারণ আমার কেউ নেই সেই রকম রহস্যময়ী।

০৩।
পরপর দুইবার প্রেমে পড়ে প্রেমে পড়া ব্যাপারটা আমার কাছে ডাল ভাত হয়ে গিয়েছিল তাই এর পরের হোঁচটের জন্য আমি আর বেশী সময় নেই না, মাত্র এক বছর। ক্লাস টেন। সঞ্জীবের একটা মাত্র লেখাই আমার পড়া, লোটাকম্বল। ঠিক কত সেই সময় আমার বয়স? ১৫? সেটা এমন একটা বয়স যেখানে নারীদের আমাদের কাছে রহস্যময় মনে হয়, বাস্তবের থেকেও বেশী রহস্যময়। সেটা এমন একটা সময় যখন বন্ধুরা গল্প বলে মেয়েদের। আর মানবীদের ব্যাপারে চিরকাল সরল আমি অবাক বিস্ময়ে শুনে যাই সেই সব গল্প, অবাক হয়ে শুনি বন্ধুদের কীর্তিকলাপ আর ছক কাটি মনের ভিতর, গল্পের ছক। নিজের সাথে। ঠিক সেই রকম একটা সময়ে আমি প্রেমে পড়ে গেলাম মুকুর, লোটাকম্বলের মুকুর, আমার শেষ কৈশরে অনেকবার স্বপ্ন দেখা মুকুর। লোটাকম্বলের নায়কের চরিত্রটা কেমন জানি ঠিক করে বললে সারাক্ষণ দোটানায় ভুগা একটা চরিত্র। সারাক্ষণ নিজের পিতার সাথে, পিতার আদর্শের সাথে যার বিরোধ কিন্তু সাহসী হয়ে যার সামনে দাড়ানোর ক্ষমতা তার নেই। আসলে পলায়নপর এক শহুরে যুবকের প্রতিচ্ছবি যেন এই যুবক। আর সেই যুবকের জীবনে আচমকা হাজির হয় মুকু। সুন্দরী, প্রখর ধারাল মুকু। এক রাত একা নায়কের সাথে এক বাড়িতে থেকেও যে ধরা দেয় না এমন রহস্যময় মুকু। আর এমন মুকুর প্রেমে আমি পড়ে গেলাম সেই ক্লাস টেনে। তারপর? তারপর আর অনেক কাল মুকু বেড়ে উঠেছে আমার কল্পনায় তার পূর্ণ মাত্রার রহস্যময়তা নিয়ে।

০৪।
আমার কাছে সব সময় পড়ার জন্য চার পাঁচটা বই জমা থাকে, ধীরে সুস্থে জমিয়ে তাড়িয়ে পড়ার জন্য। ক্লাস ইলাভেনে হাউজ লাইব্রেরীর একটা বই সেইরকম অনেকগুলো বইয়ের সাথে আমার কাছে ছিল অনেককাল। এই বইটার সাথে আসা অনেক অনেক বই পড়া শেষে লকার বা টেবিল বা বালিশের পাশ ছেড়ে চলা গেল তাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থলে কিন্তু এই বইটার কিছুতেই কিছু গতি হয় না। তিন চার বার শুরু থেকে চার পাঁচ পৃষ্ঠা পড়ার পর কেন জানি আর এগোয় না। প্রায় ছয় সাতশ পৃষ্টার মোটা বই দেখে কেউ আমার কাছ থেকে নেওয়ার জন্য তেমন একটা আগ্রহও দেখায় না। তাই বেচার কখন লকারে কখন টেবিলে আর কখনো বালিশের পাশে পড়ে থাকে পাঠকের অপেক্ষায়।

আর এরকম অপেক্ষায় রাখার পর একদিন কিছু করার না পেয়ে রাতে লাইটস অফের পর ডুব দিলাম এই বইয়ের পাতায় আর সাথে সাথে ডুবে গেলাম অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় এর বই- অলৌ্কিক জলযানে। রাত বাড়তে থাকে আর তার সাথে আমি ভ্রমণ করি বইয়ের নায়ক ছোটবাবুর সাথে বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে পৃষ্ঠা, সাথে থাকে ক্যাপ্টেন স্যালি হিংগীস, জাহাজের খালাসী, ভৌতিক জাহাজ এস,এস,সিউল ব্যাঙ্ক আর অসীম সমুদ্র। আর একজন কিন্তু থাকে, জ্যাক। ক্যাপ্টেনের সন্তান জ্যাক, খালাসীদের কাছে দাম্ভিক জ্যাক কিন্তু ছোটবাবুর কাছে যার অন্য পরিচিয় ধরা পরে অথবা জ্যাক ইচ্ছ করেই ধরা দেয়। শুধু ছোট বাবুর কাছেই ধরা পড়ে জ্যাক আসলে একজন মানবী, ছেলে পরিচয়ে বেড়ে উঠা ক্যাপ্টেনের মেয়ে জ্যাক। এইটা কিন্তু আরেক জন বুঝতে পারে, জাহাজের ফার্স্ট ইঞ্জিনিয়ার। আর তারপর অশরীরি জাহাজ এস,এস,সিউল ব্যাঙ্ক আর তার পাত্র পাত্রীদের অগোচরে চলতে থাকে ছোটবাবু আর জ্যাক। এই রকম উপন্যাসে না ডুবে কি পারা যায়? এই রকম রহস্যময়ী মানবীর প্রেমে না পড়ে কি পারা যায়?

০০।
বাস্তবের মানবীরা আমাদের অনেক কাছের কিন্তু তাতে কী? আমাদের মত সাধারণ মানুষের জন্য তাদের ভালবাসা অপেক্ষা করে না। তাই আমি প্রেমে পড়ি বারবার। ছাপার কাল অক্ষরে আশ্রয় নেওয়া মানবীদের প্রেমে পড়ি বারবার।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s