আবারো এসে গেল বিশ্বকাপ

বিশ্বকাপ আবারো এসে গেল। আবারো সেই ব্রাজিল আর্জেন্টিনা তর্ক, রাত জেগে খেলা দেখার উত্তেজনা, খেলার পরের দিন খেলা নিয়ে বিতর্ক- আবার শুরু হয়ে গেল সব। বিশ্বকাপের এই মৌসুমটা দারুণ লাগে। সম্ভবত খেলার মাঠে এই খেলাটাই বেশী খেলেছি বলে। তাই অপেক্ষায় আজকে সন্ধ্যায় বিশ্বকাপের পর্দা উঠার।

পিছন ফিরে তাকালে সবচেয়ে পুরাতন বিশ্বকাপের স্মৃতি ভেসে আসে ১৯৯৪। আমার মা আর্জেন্টিনা বিশেষ করে ম্যারাডোনার দারুণ ভক্ত। তাই সেইবার প্রথম ম্যাচে গ্রীসের সাথে আর্জেন্টিনার খেলাটা নিয়ে বাসায় উত্তেজনার কথাটাও মনে আছে স্পষ্ট। ম্যাচটা আর্জেন্টিনা জিতেছিল সম্ভবত ৪-০ গোলে। প্রথম পর্ব দারুণ ভাবে শেষ করেও ম্যারাডোনার ড্রাগ বির্তকে ছিটকে গেল আর্জেন্টিনা। তবে ঐ বিশ্বকাপের গূরুত্ব আমার কাছে অন্য জায়গায়। সেইবার আমার প্রথম বিশ্বকাপ দেখা আর সেইবারই ব্রাজিলের জয়। ছোটকালের সেই সময় তাই আমার কাছে মনে হয়েছিল সমর্থন করলে শুধু করা যায় ব্রাজিল কেই। তাই এরপর সারা জীবন ব্রাজিল সমর্থক রয়ে গেলাম।

১৯৯৮ সালে আরেকটূ বড় হয়ে গেছি। তখন শুধু দেখার জন্য দেখা নয় বরং খেলা একটু একটূ বুঝতে শিখে গেছি। সেবারো ব্রাজিলের সমর্থক। রোনালদোর তখন সেরা সময়, সাথে আছে রিভালদো। স্কুলে অনেক তর্কে হিসেব কষে দেখিয়ে দিয়েছিলাম এইবারো বিশ্বকাপ ব্রাজিলের কিন্তু আফসোস। তবে সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিদায়েও খারাপ লেগেছিল। কারণ হল্যান্ডের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালের সেই ম্যাচটা না হারলে সেমিতে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার দেখা হয়ে যেত। তখন আমার দৃঢ বিশ্বাস ব্রাজিলের এই টিম কে কোন ভাবেই আর্জেন্টিনার সেই টিমের পক্ষে হারান সম্ভব না। আর তাহলে সেমিতে যদি দুই দলের দেখা হয় তাইলে স্কুলে প্রতিদিন গিয়ে ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা এইটা নিয়ে তর্ক করা লাগবে না। তবে সেই বিশ্বকাপের স্মরণীয় স্মৃতি হচ্ছে খেলায় হেরে গিয়েও যে প্রতিপক্ষ কে মাঝে মাঝে স্যালুট করতে ইচ্ছে করে সেই রকম অভিজ্ঞতা সেই ফাইনালে প্রথম। সত্যি বলতে কি তখনও জিদান কে ভাল করে চিনে উঠতে পারি নি। শুধু জানি ফ্রান্স দলের মাঝ মাঠের ভরসা জিদান তাও এই জ্ঞানটুকু পত্রিকার কল্যাণে পাওয়া। সেই জিদান কিনা ফাইনালে ব্রাজিলের বারটা বাজিয়ে দিল। নিজে দুই গোল করে আর আরেকটা গোল করিয়ে। হায় রোনালদো সেই ম্যাচে কি যে হল তোমার।

পরেরবার ২০০২ এর বিশ্বকাপ। ব্রাজিলের তখন তথৈবচ অবস্থা। কোন রকমে কোয়ালিফাই করে আসছে। তখন থাকি হোস্টলে। আমাদের ক্লাসের ৫০ জনের মধ্যে আমরা গুটি কতেক ব্রাজিলের সমর্থক। আর কিছু গুপ্ত সমর্থক থাকলেও আর্জেন্টিনা পার্টির দাপটে তারা লুকিয়ে থাকে। আমি, রোকন, আশিক, ইরফান এরকম গুটি কতেক ব্রাজিলের ডাই হার্ড ফ্যান খালি বিপক্ষের পঁচানি শুনে যাই আর গলাবাজি করি দেখিস একদিন আমরাও। তবে বিশ্বকাপ শুরুর দিনটা ছিলাম বাসায়। ব্রাজিলের প্রথম খেলার সময়ও বাসায় ছিলাম। তুরুস্কের সাথে খেলা। তুরস্ক দারুণ ফাইট দিল যদিও হেরে গেল ২-১ গোলে। তবে সেই ম্যাচে রিভালদোর পেনাল্টিটা নিয়ে কিছু বির্তক আছে। যাই হোক এইসবই খেলার অংশ। ছুটি শেষে যখন কলেজে ফিরে আসি সেইদিনও ছিল ব্রাজিলের খেলা, চীনের সাথে। ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিল ব্রাজিল চীনাদের আর এর মাঝে ছিল রবার্তো কার্লোসের গুল্লি একটা ফ্রি কিক। তবে আর বেশী মজা পেয়েছিলাম কলেজে ব্রাজিলের এরপরের খেলাটায়, কোস্টারিকার সাথে। ৫ গোল দিয়েছিল ব্রাজিল, এর মধ্যে একটা আবার বাই সাইকেল কিকের মাধ্যমে। ব্রাজিলের খেলা দেখে তখন গুপ্ত সমর্থকেরাও অনেকে গর্ত থেকে মুখ বের করছে তাই সংখ্যা বাড়ছে আমাদের।

তবে মজা হল কোয়ার্টার ফাইনালের খেলার সময়। আর্জেন্টিনা কে হারিয়ে ইংল্যান্ড তখন ব্রাজিলের মুখোমুখি ইংল্যান্ড। আগের ম্যাচের প্রতিপক্ষের প্রতি তখন পূর্ণ সমর্থন আর্জেন্টিন পার্টির। তাদের যুক্তি যদিও ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালে পৌছেছে তাও সহজ প্রতিপক্ষের কল্যাণে। এইবার সামনে ইংল্যান্ড তাই আর নিস্তার নেই, তার উপর যে দলের কাছে আর্জেন্টিনা হারে বিশেষত তাদের কাছেতো আর নিস্তার নেই এই ব্রাজিলের। সেদিন ছিল শুক্রবার। জুমার মাঝেই খেলা। জুমার থেকে ডাইনিং এ যাবার সময় শুনি ইংল্যান্ড ১গোলে এগিয়ে। আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উল্লাস ব্রাজিলের এইবার আর নিস্তার নাই। তবে টিভি রুমে পৌছে দেখি খেলায় হাফটাইম চলছে। খেলায় তখন সমতা। রিভালদোর বাম পা ব্রাজিলের পক্ষে জোর বাড়িয়েছে। আর এরপরের হাফে তো রোনালদিনহোর সেই স্মরণীয় ফ্রি কিক। সেই খেলার পর উল্লাস আমাদের অনেকদিন মনে থাকবে। এরপরের গল্প কি আর করার দরকার আছে? সেই বিশ্বকাপটা তো ব্রাজিলের 😀

২০০৬ এর শুরুতে অবশ্য দারুণ প্রত্যাশা ছিল। ব্রাজিলের টিম লাইন আপটাই ভরসা জাগাচ্ছিল। রোনালদো,রোনালদিনহো, রবিনহো, আদ্রিয়ানো, কাকা, কার্লোস- সবাই ফর্মে। এরমাঝে রোনালদিনহো ছিল তার সেরা সময়ে। অন্যগ্রহের ফুটবলার হতে তার তখন দরকার একটা বিশ্বকাপ। তাই সমস্ত ব্রাজিল সমর্থকদের মত আমার কাছেও ব্রাজিল ছিল সেই বিশ্বকাপের সেরা লাইন আপ। তবে কাগজের হিসেবে সব সময় বাস্তব চলে না। তাই লাইন আপটা সেরকম করে ক্লিক করল না। যাদের খেলার কথা অন্য গ্রহের ফুটবল তারা হতাশ করল। তবে বিশেষ করে হতাশ হলাম কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের সাথে খেলায়। জিদানের জাদুর কাছে আবার অসহায় হয়ে পরল ব্রাজিল। তবে সত্যি বলতে কি একজন শিল্পী যখন নিমগ্ন মনে শিল্প সৃষ্ট করে যান তখন অনেক সময় তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। ব্রাজিলেরও উপায় ছিল না তাই পুরা খেলাটাই তাদের জিদান জাদু দেখতে হল।

২০০৬ এ আমার কাছে উপভোগ্য মনে হয়েছিল জিদান কে। বুড়ো, শেষ হয়ে গেছে এরকম নানা গুঞ্জনের ভিতর থেকে এরকম অতিমানবীয় পারফরমেন্স সম্ভবত জিদানের মত গ্রেট প্লেয়ারের পক্ষেই করা সম্ভব। কি খেলাই না দেখাল লোকটা। তবে এই কিংবদন্তী সম্ভবত তার তুলির শেষ আঁচড়টা দিলেন ফাইনালে। মাতারাজ্জি কে তার সেই ঢুসটা না মারলে হয়ত সেই ফাইনালে বিজয়ী দলের নাম ফ্রান্সই হত। এরকম মঞ্চ সব সময় প্রস্তুত থাকে না, জিদান পেয়েছিলেন তবে সফল হলেন না। হয়ত ফুটবলের চিরন্তন রূপকথার অংশ হয়ে থাকার জন্যই এই পরিণতি।

এইবারও বিশ্বকাপ এসে গেছে, ২০১০। ব্রাজিল আর্জেন্টিনা তর্কের ঝড় উঠেছে আবার আড্ডায়, ফেসবুকে। এবার অবশ্য ব্রাজিল টিম বলার মত তেমন শক্ত নয় কিন্তু আশায় আছি। আশা যোগাচ্ছে ২০০২ এর ইতিহাস। স্পট লাইট নেই কিন্তু এই লাইন আপ ফাইনাল জিতার যোগ্য। এদিকে আর্জেন্টিনা টিম অবশ্য দারুণ শক্ত। মেসিও আছে দারুণ ফর্মে। পেলে, ম্যারাডোনাদের সাথে এক কাতারে দাড়াতে তার এখন বিশ্বকাপটাই দরকার। তবে ইতিহাস বড় শক্ত বান্দা সে কাউকে সহজে জায়গা দেয় না, গতবার রোনালদিনহো কে দেয় নি। দেখা যাক মেসি এইবার সে জায়গা নিতে পারে কিনা।

তবে এইবার আমার মতে সব চাইতে ব্যালান্সড টিম স্পেন। আট্যাকিং থেকে ডিফেন্স সব জায়গায় তাদের দারুণ সব প্লেয়ার আছে। দেখা যাক বছরের পর বছর ফেভারিট থেকেও শিরপা না জিতার ট্রেডিশন থেকে দলটা বের হয়ে আসতে পারে কিনা। তবে শিরপার দাবিদার হতে পারে ইতালী, জার্মানী, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডও। তাই দেখা যাক জুলাইয়ের ১১ তারিখ শেষ হাসিটা কে হাসে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s