প্রতিশোধ

দিন শেষের এই সময়টা বড় ক্লান্ত লাগে। সারাদিন অফিস, তারপর প্রায় এক ঘন্টার মত বাসে ঝুলে থাকা, গরম, মাথার ভিতর রাজ্যের যত চিন্তা- সব মিলিয়ে কেমন জানি গুলিয়ে যায়। অনেক সময় আর হিসেব ঠিক থাকে না। দু’টো লোক বেশি তুলবার জন্য বাসটা রিক্সাটার পিছনে মাথা ঢুকিয়ে দেয়। আবার সিগন্যাল পড়ে। আবার প্রায় দশ মিনিট। হঠাৎ মুখ দিয়ে গালি উঠে আসে- ঐ হারামজাদা ড্রাইভারের বাচ্চা, রিক্সার পিছনে না গেলে তোর হইত না। আশেপাশের সবাই ফিরে তাকায়, দুই একজন মৃদুস্বরে গলা মিলায়। কিন্তু সবাই ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। বয়স হয়েছে। এখন আর আগের মত গলাবাজি সবসময় মানায় না কিন্তু দিন শেষে সব হিসাব ঠিক থাকে না।

হিসাব ঠিক থাকে না তাই সব গুলিয়ে যায়। বাড়ি থেকে হঠাৎ মেহমান আসছে, ভাল-মন্দ কিছু রান্নার প্রয়োজন। বাস থেকে নামার সময় বাঁ পকেটে লিস্টিটা অস্তিত্বের জানান দেয়। সপ্তাহের মাঝখানে বাজারের ঝামেলা, হইচই সব হিসাব আর উল্টোপাল্টা করে দেয়। লিস্টি মিলিয়ে ঘুরতে থাকি- কাররোল, পটল, ডানো ৪০০ গ্রাম, ধনিয়া, মাছ। দরদাম, হইচই। টাকার হিসেব মিলে না। সবকিছুর দাম খালি বাড়ছে। আচ্ছা শেষ কবে মাছ কিনতে গিয়ে কোন ঝগড়া হয় নি? নতুন বস শালা একটা হারামি। হাঁটুর বয়েসী কিন্তু ভাবখানা যেন দুনিয়ার সব বিষয়ে অভিজ্ঞ। ব্যাটা অফিসের বস তার মানে এই না যে তুই সবখানেই বেশি জানবি, উপদেশ দিবি। কিন্তু শালা তাও উপদেশ দিবে। আয়নায় নিজের চেহারা কি একবারও দেখেছে ছোকরা। হাঁটুর সমান বয়স। মাছ কাটুনী প্রশ্ন করে- স্যার, টুকরা ছোট হবে না বড়? বড়ই কর। মেহমান কে তো আর ছোট পিস দেওয়া যায় না। শালা লাঞ্চ আওয়ার শেষে প্রায় দিনই গল্প করবে। বাকি সবাই যায় তাই যেতে হয়। কথা শুনে সবাই একসাথে মাথা নাড়ায় যেন এটাই একমাত্র সত্য কথা।

সারাদিন অফিস শেষে বাসায় ফিরে আর ভাল লাগে না। দু’য়েকটা চ্যানেল ঘুরে নাটক টাটক দেখা, মাঝখানে হয়ত একবার খবর তারপর খাওয়া এরপর ঘুম। অন্য কিছু করার সময় কই। কিন্তু এখন তাও মাঝে মাঝে রাত জেগে খেলা দেখতে হয়। নাইলে লাঞ্চ আওয়ারে ব্যাটা হয়ত প্রশ্ন করে বসবে- “কালকে টেস্টটা দেখছেন? কি দারুণ সুইং করাল পাকিস্তানিরা দেখছেন? আমরা যে কবে এদের থেকে কিছু শিখব।” খেলাধূলা জিনিসটাই আমাকে কখনো খুব বেশি টানে নি। তারপরেও খেলা শেষে এন্যালাইসিস শুনে আর পরেরদিন খেলার পাতার থেকে ধার করে বলতে হয়- আমিরের আউট সুইং মারাত্মক। অবশ্য উপায় নেই। অফিসে বলাবলি হচ্ছে প্রমোশন সিলকশনের মিটিংটা আগামী মাসেই নাকি হবে। এইবার হাইয়ের বাচ্চা কে টপকাতে না পারলে আর আশা নেই। লিস্টি থেকে এখনো মুরগী কেনা বাকি।

তাও ভাল শালা খালি পাকিস্তানের খেলা নিয়েই পাগলামি করে। নাহলে হয়ত সারা বছর খেলা দেখেই রাত কাটান লাগত। ব্যাটা বলে- ” আরে পাকিস্তান কে সাপোর্ট না করে উপায় আছে! যেরকম আন প্রেডিক্টবল। এরকমই তো একটা দল দরকার। কখনো হার কখনো জিত। কিন্তু দেখেন কোন জায়গা থেকে থেকে টিমটা জিতে আসে। পুরাই ১৮০ ডিগ্রি এব্যাউট টার্ণ। এই রকম জয় দেখলেই না মজা।” সামনে আরেকটা সিরিজ নাকি আছে, মানে আর তিন রাত। বাসা থেকে দেশি মুরগি নিতে বলছে। সামনের খাঁচা থেকে দুইটা নামাতে বলতেই দোকানদার বলে- নিয়েন না স্যার। আপনে বান্ধা কাস্টমার, আপনেরে ঠকামু না। এইগুলা দেশি না পাকিস্তানি মুরগি। দেখতে দেশির মতই কিন্তু একদম স্বাদ নাই। এইবার মনে দারুণ একটা হাসি আসে, অনেকদিন পর চান্স পাইছি। জোরে বলি- আরে এইগুলাই দাও। পাকিস্তানি গুলারে ভাল করে ছুইলা দাও।

Advertisements

2 thoughts on “প্রতিশোধ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s