ঈদে বাড়ি যাওয়া

ঈদের আর মাত্র একদিন বাকি। পরিচিত অনেকে ঢাকা ছাড়ছে, অনেকে ছাড়বে। সবাই বাড়ি যায়, বাড়ি। বাসে জ্যাম, ট্রেন দেরিতে ছাড়ে, স্টিমার ডুবে যাবার ভয়। তাও সবাই এই শহর ছাড়তে চায় কারণ হয়ত দূরে কোথাও কোন গ্রামে কিংবা কোন এক মফস্বলে কেউ অপেক্ষায় আছে। হয়ত তাই হাজার টা কষ্টের শেষেও সবাই অপেক্ষায় থাকে, বাড়ি যাবার অপেক্ষায়।

“বাড়ি” শুধু মাত্র এই একটা শব্দ এই শহরের মনস্তত্তের এক বিশাল দিক তুলে আনে। জিজ্ঞেস করুন, দেখবেন এই শহরের বেশির ভাগ মানুষের দু’টি ঠিকানা- বাসা এবং বাড়ি। বাসা কই? বাসাবো। বাড়ি কই? চট্টগ্রাম। ঠিক এইভাবে আমরা দু’টো শব্দ কে আলাদা করে ফেলি, আমাদের পরিচয় কে আলাদা করে ফেলি। হয়ত এই দুইটি শব্দের জন্য এই শহরে বছরের পর বছর থেকেও আমরা ঠিক নাগরিক হয়ে উঠি না কারণ আমাদের বাড়িতো এইখানে না, দূরে কোথাও কোন এক গ্রামে। আমার বাবা পড়াশোনার জন্য গ্রাম ছেড়েছিলেন প্রায় ৩৮ বছর আগে। এরপর আর প্রতি বছরের ছুটিছাটা ছাড়া স্থায়ীভাবে গ্রামে গিয়ে আর তার থাকা হয়ে উঠে নি। আমার মা জন্মের পরের কয়েক বছর ছাড়া প্রায় পুরো জীবনটাই কাটাল কোন না কোন শহরে। আমাদের ভাইবোনের জন্ম শহরে, বেড়ে উঠাও কোন না কোন শহরে। তারপরেও শহরটা আমাদের বাড়ি হতে পারে নি, বাসাই রয়ে গেল।

আরেকটু ছোট থাকার সময় প্রতি বছর এই ঈদের সময়টা আমি আর আমার ছোটবোন অপেক্ষায় থাকতাম বাড়ি যাবার। বাড়ি যাবার মেলা ঝামেলা কারণ আমাদের বাড়িতে সোজাসুজি যাবার কোন উপায় নেই কারণ জায়গাটার নাম সন্দ্বীপ। যেভাবেই যান, যেখান থেকেই যান সেখানে যাবার মেলা হ্যাপা। প্রথমে বাস ধরুন কিংবা ট্রেন ধরুন ভিড়, ধাক্কাধাক্কি, জ্যাম, অপেক্ষা আর ক্লান্তি সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম পৌছুতে পৌছুতে বেলা প্রায় শেষ। এই বিকেলে সন্দ্বীপ যাবার আর কোন উপায় আর আপনার নেই, এই রাতটা আপনাকে অপেক্ষা করতেই হবে। তাই চলো মামা বাসা। খেয়াল করুন সেটাও কিন্তু বাসা। যাই হোক সেই পুরাতন হলুদ রঙের বেবিটেক্সি গুলো করে পুরাতন স্টেশন ছাড়িয়ে আগ্রাবাদ, লালখান বাজার, জিইসি পেরিয়ে তবেই মামার বাসা। তারপর সন্ধ্যায় ছোটদের কিছুটা গল্প, বেশিটা ছোটোছুটি তারপর তাড়াতাড়ি রাতের খাবার কারণ বেশ সকাল সকাল উঠতে হবে, স্টিমার ধরতে হবে।

সেই স্টিমার ধরা নিয়েও বহু রকম হিসেব নিকেশ। যখন ছাড়বে তখন জোয়ার থাকবে না ভাটা, যখন পৌছাবে তখনো জোয়ার থাকবে না ভাটা। উহু, ভাববেন না এই হিসেব অযথাই। দুই কূলেই জোয়ার থাকলেতো ভাল, এক কূলে থাকলেও চলে আর যদি দুই কূলেই ভাটা থাকে তাইলে কী হবে সেটা বুঝতে হলে আপনার কাদার মধ্যে দিয়ে হাটার অভ্যাস থাকতে হবে। এই হাটা ছোটখাট কিছু নয়, কখনো কখনো এই হাটা দুই তিন মাইলের বেশি। ভাবছেন এ বুঝি তেমন কোন কষ্ট নয় কিন্তু কাদায় প্রথম পা দেওয়ার সাথে সাথে যখন শরীরের হাটু পর্যন্ত কাদায় ডুবে যাবে তখন বুঝবেন জোয়ার ভাটার হিসেব কেন এত জরুরি। আমরা যারা ছোট তাদের কাদায় নামার অনুমতি নেই। তারা চড়বে বড়দের কার না কার কোলে না হয় ঘাড়ে। ছোটবোনও কোলে আমিও কোলে! এটা মানা যায় না তাই নিচে নামার জন্য জোরাজুরি করলে হয়ত বিরক্ত হয়েই একসময় নামিয়ে দিবে, ভাবখানা এমন দেখি কাদায় ব্যাটা কতক্ষণ হাটাহাটির শখ থাকে। নামার সাথে সাথেই বুঝে যাই না কাজটা ভাল করি নাই কিন্তু এখন আর উপায় নাই। কারণ পায়ে কাদা লেগে গেছে তাই কোলে চড়ার আর উপায় নাই, সেই সাথে ছোট বোনের থেকে একটূ বড় থাকতে গেলে এইটুকু কষ্ট করতেই হবে। একটু হাটার পরপরই বুঝতে বাকি থাকবে না এইখানে সোজাসুজি হাটা যাবে না, হাটার সময় পায়ের বুড়ো আঙ্গুল একটু বাকিয়ে তারপর পা কে মাটির সাথে কোণাকুণি করে ফেলতে হবে। পা তোলার সময়ও কোণাকুণি করে তুলতে হবে নাইলে উপায় নাই।

তবে এই কষ্টটুকু কমাতে চাইলে উপায় আছে। ডিঙ্গি নৌকা। ভাটার সময় কাদার ভিতর দিয়ে ঢেলে নিয়ে যায় যাত্রীদের এটা। না বুঝলে আবার বলি পুরা দুই তিন মাইল কাদার ভিতর দিয়ে এই নৌকা আপনাকে ঢেলে নিয়ে যাবে। আপনি নৌকায় বসে থাকবেন আর পনের বিশজন অমানুষিক পরিশ্রম করে নৌকাটা ঢেলে নিয়ে যাবে। তবে ভাড়া অবশ্যই বেশি এবং নৌকা কম থাকায় স্টিমার থেকে নামা সবাই কিন্তু এইখানে উঠার চান্স পাবে না। নৌকা যারা ঠেলছে তারা সুর করে কবিতার মত করে একটা গান বারবার গাইতে থাকে। গানের শুরুটা অনেকটা এরকম- হেইয়োরে, মারো টান, আল্লার নামে, নবীর নামে…। তবে একটু কান পেতে শুনলে আর মজা পাবেন কারণ গানের মধ্যে একি সাথে যেমন আল্লাহর নাম আসবে, নবীর নাম আসবে ঠিক তেমনি আসবে কিছু কিছু দেব দেবীর নাম। একটু বড় হয়ে যখন গানের কথাগুলো মনযোগ দিয়ে খেয়াল করলাম তখন বেশ অবাক হয়েছি। এখন অবশ্য তেমন একটা অবাক হই না কারণ এটা আমার বিষয় না এটা নৃতত্ত্বের বিষয় 🙂

অবশ্য কাদায় হাটুন, শুকনায় হাটুন কিংবা ডিঙ্গিতে উঠুন তার আগে আপনাকে আরেকবার নৌকায় উঠতে হবে। কারণ স্টিমার থেকেতো আপনাকে প্রথমে নামতে হবে। সেই স্টিমার গুলোর নাম হয়- রাঙ্গাবালি, মহেশখালি কিংবা আলাউদ্দিন। এই স্টিমার থেকে নামার ব্যাপারটা সবচেয়ে ভয়ংকর। এই পর্বে আসলেই সবসময় আমার চোখ-মুখ শক্ত হয়ে যায়, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায় কারণ পানিকে আমার দারুণ ভয়। শেষবার আসার সময়তো ভাবী হাসতে হাসতে শেষ কারণ নৌকায় উঠার পর আমার চেহারা নাকি হয়েছিল ফাঁসির আসামির মত। অবশ্য আমার কী দোষ একমাত্র আমিই যে সাতার জানি না।

এইসব স্টিমার, নৌকা, কাদা, ডিঙ্গি, হাঁটা পর্ব শেষ করে আপনি যখন ক্লান্তির শেষ সীমায় ঠিক তখন পৌছে যাবেন খাড়ির কিনারায়। এটা আসলে সন্দ্বীপ রক্ষা বাধ কিন্তু সবাই ডাকে খাড়ি। প্রায় বিশ ফুটের মত উঁচু তবে কাজের সময় এটা আর ঠিক থাকে না। তাই প্রতি বর্ষায় এটা ভাঙ্গে আর প্রতি শীতে আবার নতুন করে ঠিক করা হয়। অবশ্য কেউ কোন উচ্চবাচ্চ করে না এটা নিয়ে কারণ প্রতিবার ঠিক করা মানেই নতুন টেন্ডার, অনেক টাকা।

এই খাড়ির গোড়ায় আসলে প্রথমেই যে জিনিসটা আপনার নাকে প্রচন্ড ধাক্কা দিবে সেটা হল শুটকির গন্ধ। এই গন্ধটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বুঝে যেতাম এসে গেছি আসল সন্দ্বীপ। আর সেখানে অপেক্ষা করছে রিক্সা। দাদাবড়ি থেকে পাঠানো রিক্সা এসে গেছে। প্রায় সময় রিক্সা নিয়ে আসত আলম ভাই। সাথে আর অন্য কয়েকজন কারণ এক রিক্সায় তো আর হবে না, চট্টগ্রাম থেকে এসেছি তো আমরা অনেকে। তো এই রিক্সাওয়ালা আলম ভাই কখনোই আমার নামটা ঠিক করে উচ্চারণ করতে পারত না। ডাকত- নেভি ভাই ভাল আছেন। আমি ক্ষেপে যেতাম তবে উপায় নেই নিবিড় শেষ পর্যন্ত নেভিই থেকে যেত। এমনকি কাজিনদের মাঝে আমার নামটাই হয়ে গেল নেভি, নেভি সিগারেট।

এরপর শুরু হত যাত্রার আসল অংশ, মজাদার অংশ। এ জার্নি বাই রিক্সা। সারি বেধে অনেকগুলো রিক্সা। আমাদের গ্রামের নাম মাইটভাঙ্গা। সে অনেক দূর। তাই চল আবার রিক্সা করে আর ঘন্টাখানেক। তবে চিন্তা নেই এই অংশে আপনার ক্লান্তি একদম দূর হয়ে যাবে। মাটির রাস্তা। আকাবাঁকা, কোথাও ভাঙ্গা। শেষ বিকেলে সেই সময়টায় যখন সূর্যের আলো মিষ্টি হতে হতে আস্তে করে সন্ধ্যায় মিলিয়ে যায় ঠিক সেই সময়টায় রিক্সা চলে আস্তে, মৃদু গতিতে। প্রথমে অনেক বড় বড় খালি মাঠ, ধান কাটা হয়ে গেছে বা হবে। এটাকে বলে চর। মানুষজন বড় কম। খালি যারা চাষের উপর নির্ভরশীল তারাই শুধু থাকে এ অংশে। আসলে উপায় নেই বলেই থাকে। কারণ ঘূর্ণিঝড়ের সময় মৃত্যুর পরিমাণ এ অংশেই বেশি। আর দ্বীপের এ অংশটাই সম্ভবত সবচেয়ে দরিদ্র। হঠাত হঠাত দেখা দেওয়া বাড়ি গুলো সে কথাই জানান দেয়। আমার অবশ্য এত সুক্ষ ব্যাপার স্যাপারে নজর দেওয়ার সময় নেই। আমি তখন চিন্তা করি আসার পথে কয়টা রিক্সাকে টপকে গেল আমাদের রিক্সা কিংবা বাড়িগুলোর সামনের সুপারি বা নারিকেল পাতা দিয়ে দেওয়া পর্দার আড়ালে কাদের দেখা যায়। আর বেশি বিরক্ত হলে প্রশ্ন করি- আর কতদূর যেতে হবে।

এরপর মিষ্টি আলো নিভে আসে, আসে করে আর রিক্সা তার মৃদু গতিতে এগোয়। আমি রিক্সা গুনি, বাড়িগুলোর সামনে থাকা কবর গুলোকে দাদির শিখানো নিয়ম অনুযায়ী সালাম দেই। আবার হিসেব করি আসার পথে কয় নেকি হল। নেকির হিসেব করতেই মগধরা গ্রাম পেরিয় যায়, পেরিয়ে যায় ধোপার হাট, এগিয়ে আসে মাদ্রাসা। মাদ্রাসার পুকুর টা পেরিয়ে ঠিক যখন একটা স’মিল আর তার সামনে পড়ে থাকা গাছের গুড়িগুলো দেখতে পাই ঠিক তখন আমার উত্তেজনা বেড়ে যায়। কারণ স’মিল মানেই আর কয়েকশ গজ পরেই বাড়ি। বাসা নয় বাড়ি। বাসা নয় বাড়ি বলেই হয়ত ঠিক এই সময় প্রথমবারের মত বড়রা উত্তেজিত হয়ে উঠে। অনেক সময় আমাদের থেকেও বেশি। এটা আমি ঠিক ঠিক টের পাই কারণ সারা রাস্তায় আমাকে কম কথা বলতে বললেও এই প্রথম বড়রা নিজেরাই কথা বলে উঠে। এক রিক্সা থেকে অন্য রিক্সায়। জানান দেয় বাড়ি এসে গেছে।

রিক্সাটা যখন শিবের হাটের তেমাথার একটু সামনেই ডানে মোড় নেয় তখন কেন জানি একটা অন্যরকম আনন্দ হয়। বাড়ির ছোটরা রাস্তার মাথায় অনেক আগে থেকেই দাড়ান থাকে কারণ চিটাগাং থেকে সবাই আসবে অনেকদিন পর। রিক্সা মোড় নেওয়ার সাথে সাথেই পিচ্চিদের কেউ না কেউ দৌড়াতে থাকে বাড়ির দিকে, খবর দিতে যে সবাই এসে গেছে। রিক্সা থেকেই আমরা দেখতে থাকি পিচ্চি দৌড়াচ্ছে। দেখতে দেখতে যখন রিক্সাগুলো ঠিক বাড়ির মাঝখানে এসে দাঁড়ায় ঠিক তখন বাড়ির সবাই বের হয়ে আসে- ফুফুরা, চাচীরা। এত এত লোক কে পায়ে ধরে সালাম করতে করতে কোমর ব্যাথা করে উঠে কিন্তু তারপরেও আনন্দ হয় অন্যরকম আনন্দ।

এই বছর আর বাড়ি যাওয়া হবে না ঈদে। আসলে গত বছর দুই তিন ধরেই আর যাওয়া হয় না। দাদী মারা যাওয়ার পর আস্তে আস্তে যখন সবাই চলে আসল এর পর থেকে আর তেমন একটা যাওয়া হয় না। তাই আমাদের এখনকার ঈদ হয় শহরে। বন্ধুরা থাকে, টিভি থাকে, কম্পু থাকে, নেট থাকে, ব্লগিং থাকে, সারাদিনের ঘোরাঘুরি থাকে কিন্তু তারপরে ঠিক কী যেন একটা থাকে না। কারণ ঈদের দিন আমরা আবার স্টিমারের কথা বলি, কাদার কথা বলি, হাটার কথা, রিক্সার কথা বলি। টেলিফোন থেকে টেলিফোনে সেই একই বার্তা যায়। আর ফোনে ফোনে কথা বলতে বলতে আমরা টের পাই আমরা আবার একবার পিছনে ফিরে যেতে চাই কারণ হয়ত এটা আমাদের বাসা আর ঐটা আমাদের বাড়ি।

Advertisements

7 thoughts on “ঈদে বাড়ি যাওয়া

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s