মন পবনের নাও ১২

০।
আজকে প্রায় সারাদিন ঘুমে ছিলাম। সকাল টু সন্ধ্যা, মাঝখানে দুপুরের খাবার সময়টুকু বাদে। তাই সন্ধ্যায় যখন এই কয়দিনের মত হেমন্তের বই মেলায় যাবার জন্য বের হলাম তখনো বাইরের খবর জানি না। বাসার থেকে বের হয়ে মেইন রাস্তায় আসতে আসতে দেখি রাস্তায় গাড়ি ঘোড়া তেমন একটা নেই, ভাবলাম শনিবার তাই হয়ত ভীড় কম। কিন্তু পরিবাগ ওভারব্রিজের উপর উঠে একটু অবাক হলাম। কারণ সকাল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত এই ওভারব্রিজের উপর মানুষের মোটামুটি অভাব হয় না কিন্তু আজকে তা প্রায় পুরাই ফাঁকা, খালি উপরে দুইজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। ওভারব্রিজের উপর থেকে নিচে তাকিয়ে দেখি নিচেও মানুষের থেকে পুলিশ বেশি। শেরাটনের উলটা দিক দিয়ে আসতে আসতে পুলিশের সংখ্যা দেখে একবার ভাবলাম বুঝি শেরাটনে কোন ভিআইপি এসেছে কিন্তু যখন শাহাবাগের কাছাকাছিও পুলিশ দেখলাম তখন বুঝলাম ব্যাপারটা নিশ্চয় গোলমেলে কিছু। মেলায় ঢুকেই ব্যাপারটা প্রায় নিশ্চিত হলাম। বন্ধের দিন এই শনিবারেও মেলা প্রায় ফাঁকা। এমন কী হুমায়ূন আহমেদের স্টলের সামনেও খুব বেশি একটা লোক নেই। মেলার ভিতর পাবলিক লাইব্রেরির সিঁড়ির সামনে দেখি টুটুল ভাই, লীলেন্দা আর ভাবী গল্প করছে। সেখানেই ব্যাপারটা পুরাপুরি নিশ্চিত হওয়া গেল, কালকে হরতাল।

হরতালের ঘোষণার পর ঢাকার কোথায় কোথায় নাকি গাড়ি পোড়ানো হয়েছে। একে তো হঠাৎ ঈদের আগে হরতালের ঘোষণা তার উপরে মারামারি আর গাড়ি পোড়ানোর খবর, সব মিলিয়ে ভালই একটা প্যানিকের তৈরি হয়েছে। তাই মেলা থেকে বের হয়েই দেখি শাহবাগ রাত আট টা বাজেই বেশ ফাঁকা। মাশ্রুম আড্ডার নিয়মিত মানুষ রাইয়্যান ভাই পর্যন্ত আসে নি আজকে হরতালের কারণে। এর মধ্যে বণিক ভাই ভাবছে কালকে সকালে কীভাবে রাতের ডিউটি সেরে বাসায় ফিরবে, লীলেন্দা ভাবছে কালকে সকালে রিক্সায় অফিস যেতে খুব একটা খারাপ হবে না, আমি ভাবছি কালকে সকালে এক জায়গায় যাব ভেবেছিলাম আর যাওয়া হবে না। এইসব ভাবতে ভাবতেই গত কয়েকদিন আগে এক জনের ফেসবুকের ইনফো তো দেখা একটা কথা মনে হল। ইনফোতে পলিটিক্যাল ভিউ এর জায়গায় লিখা ছিল- don’t bother about politics. আজকাল আমাদের বয়েসি অনেকেই বলে রাজনীতি নিয়ে তাদের কোন আগ্রহই নেই। একসাথে সব মিলিয়ে হঠাৎ মনে মনে একটা হাসি আসে। এই যে আজকে রাস্তা ঘাটে মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়া, রাস্তায় গাড়ি পোড়ানো, এমনকী আড্ডায় বার বার উঠে আসা হরতালের কথা সব কিন্তু একটা কথাই বলে bother না করলেই কী রাজনীতি থেকে বেঁচে থাকা যায়?

০১।
গত কয়েকদিন আগে পরীক্ষার রেজাল্ট দিল। রেজাল্ট শিট বারবার দেখতে দেখতে একটা মজার জিনিস খেয়াল করলাম। চার বছর আগে আমরা যখন ক্লাস শুরু করি তখন শুরুর দিকে আমরা যাদের ক্লাসের সব চাইতে ব্রিলিয়ান্ট ভাবতাম তাদের অনেকের নামই রেজাল্ট শিটের উপরের দিকে নেই। বরং শুরুর দিকে মাঝামাঝি থাকা অনেকেই আজকে একদম উপরের দিকে উঠে এসেছে। ভাবতে ভাবতেই দেখলাম যারা উপর থেকে নিচে নেমে গেছে তাদের তুলনায় যারা উপরে উঠে এসেছে তারা যে হঠাত করে প্রতিভাবান হয়ে গেছে তা না। বরং তারা অন্য একটা দিক দিয়ে নিচে নেমে যাওয়া অনেককেই হারিয়ে দিয়েছে। সেটা হল চেষ্টা। তখন সিরাত ভাইয়ের লেখা একটা সিরিজের কথা মনে পড়ে গেল এবং বাস্তব দ্বারা আবার বুঝে গেলাম প্রতিভাই সাফল্যের একমাত্র চলক নয়।

০২।
আমাদের বাসার উপরের তালায় এক পিচ্চি থাকে, ঠিক আমার রুমের উপরেই থাকে। মাঝে মাঝে রাতের বেলা তার দৌড়াদৌড়ি টের পাওয়া যায়। প্রথম যখন পিচ্চিটাকে দেখি তখন মনে হয় একটু একটু দাড়াতে শিখেছে। সেইদিন সকালে দেখি স্কুলের ড্রেস পড়া। খয়েরি প্যান্ট, সাদা শার্ট, ব্ল্যাক শু। পরে শুনি প্রি-স্কুল টাইপ কী নাকি চালু হয়েছে সেখানেই যায় প্রতিদিন পিচ্চি। আরেকদিন দেখি কোয়ার্টারের সামনের রাস্তাটা বেশ ফাঁকা তার উপর একটা গাছের ডাল নিয়ে আপন মনে ছোটাছুটি করছে। আর অদৃশ্য কার উদ্দেশ্যে কী যেন বলছে। দোতালা থেকে আর ভাল করে খেয়াল করে দেখি রাস্তার ঐপাশটায় একটু ঝোপঝাড় টাইপ একটা জায়গা আছে সেখানে এক হলুদ রঙের প্রজাপতি কে ধরায় ব্যস্ত সে। সম্ভবত সে প্রজাপতির উদ্দেশ্যেই বলছে কিছু। খাবার টেবিলে এই ঘটনা বলতে একদিন মাতাজান বলে আমিও নাকি ছোটকালে ঠিক এইভাবে ছোটাছুটি করতাম। আবার একদিন বিকেলে পিচ্চি কে নিচে ছোটাছুটি করতে দেখে মনে হল আরে ছোটকালে আমার ছোট বোনও মনে হয় ঠিক এভাবেই ছোটাছুটি করত। বুঝলাম আমরা সবাই আসলে সুন্দর কিছু দেখলেই আমাদের প্রিয় স্মৃতি গুলোর সাথে তাকে জড়াতে চাই।

০৩।
মাঝখানে তারেক ভাই একটা বই দিয়েছিল, ডিকলোনাইজিং দ্যা মাইন্ড। লেখক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো (এই নামটা কখনোই মনে থাকে না, লেখার সময়ও বই থেকে দেখে লিখলাম :P)। তা খটোমটো নামের এই লেখকের ততোধিক খটোমটো অনুবাদে লিখা একটা বই। দাঁত বসাতে কষ্ট হয় বলে সহজে এইসব বই পড়তে ইচ্ছে হয় না। কিন্তু তারেক ভাইয়ের কাছ থেকে বিষয়বস্তু শুনে মনে হলে ইন্টারেস্টিং তাই পড়া শুরু করে দিলাম। পড়তে পড়তেই দেখলাম অনুবাদ খটোমটো হলেও বিষয়ের জন্য পড়তে তেমন খারাপ মনে হয় না। বইটাতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখিয়েছেন আফ্রিকায় ইউরোপিয় সাম্রাজ্যবিস্তার কীভাবে শুধু তাদের ভৌগলিকভাবে পরাধীন করে নি বরং সাংস্কৃতিক ভাবে তাদের দেওলিয়া করেছে। শুধু একটা উদাহারণ দিলেই ব্যাপারটা বুঝবেন। লেখকদের সময় স্কুলে তাদের স্থানীয় ভাষায় কথা বলা নিষেধ ছিল, কথা বলতে হত ইংরেজিতে। যে স্থানীয় ভাষায় কথা বলত তার জন্য শাস্তি বরাদ্দ ছিল। তা স্থানীয় ভাষায় কথা বলা বন্ধ করার জন্য স্কুলে চালু করা হল এক অভিনব পদ্ধতি। দিনের শুরুতে ক্লাসের যে ছেলে বা মেয়ে ক্লাসে স্থানীয় ভাষায় কথা বলত তাকে শিক্ষক একটা বোতাম দিয়ে দিত। এরপর সে ছেলে বা মেয়ের দ্বায়িত্ব হত তার পরে যে স্থানীয় ভাষায় কথা বলে তাকে বোতাম টা দিয়ে দেওয়া। এভাবে বোতাম টা একের পর এক হাত বদল হত। দিন শেষে শিক্ষক আবার খোঁজ করত বোতামটা কার কাছে। যার কাছে বোতাম পাওয়া যেত তাকে প্রশ্ন করা হত সে কার কাছ থেকে বোতামটা পেয়েছে। এভাবে সবাই কে প্রশ্ন করে করে জানা হয়ে যেত আজকে ক্লাসে কে কে স্থানীয় ভাষায় কথা বলেছে। স্কুল শেষে তাদের সবার জন্য বরাদ্দ হত শাস্তি। শুধু এ থেকেই বুঝা যায় কীভাবে আস্তে আস্তে ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে আফ্রিকার স্থানীয় সংস্কৃতি কে কারণ পরাজিত মানুষের ঘুড়ে দাড়াবার সবচেয়ে বড় শক্তি নিহিত থাকে তার নিজস্ব সংস্কৃতিতে।

০৪।
কয়েকদিন আগে বান্দবন, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ঘুরে আসলাম। রাঙ্গামাটি আগেও কয়েকবার যাওয়া হয়েছে কিন্তু বাকি দু’টোয় এই প্রথম। আমি এমনিতে প্রচন্ড ঘরকুণো মানুষ কিন্তু কেন জানি বন্ধুবান্ধবদের সাথে ঘুরতে বেড়োলে খারাপ লাগে না বরং বেশ ভালই লাগে। এইবারো তাই হল। সারাদিন ঘোরাঘুরি, রাতে গল্প। তবে এইবার বেড়ানোর সময় একটা দীর্ঘশ্বাস অনেকের মুখ দিয়ে প্রায়ই বের হয়েছে। ছাত্র জীবন শেষ হয়ে আসছে হয়ত এরপর বন্ধুরা সবাই মিলে এইভাবে একসাথে ঘুড়ে বেড়ানো হবে না। হয়ত তাই সবার মধ্যে এবার যেভাবেই হোক ট্যুর টা উপভোগ করার চেষ্টা ছিল। এমন কী গ্রুপের সবচেয়ে গোমড়ামুখো ছেলেটাও চান্দের গাড়ির ছাদে বসে হইচইয়ে ব্যস্ত ছিল। সামনে শংকা থাকলেই হয়ত অনেক সময় বর্তমানটাকে উপভোগ করার চেষ্টা বেড়ে যায়।

০০।
লিখতে লিখতেই হিসেব করে দেখলাম মন পবনের নাও সিরিজটা শুরু করছিলাম প্রায় বছর দেড়েক আগে। তখন কেমন যেন একটা জোশ ছিল। হাতে ঘন্টা খানেক সময় পেলেই নতুন কিছু একটা লিখে ফেলতাম। তাই মাস দুই তিনের মধ্যেই লিখে ফেললাম মন পবনের নাওয়ের আট নয়টা পর্ব। সচলে আমার প্রিয় দিনলিপি সিরিজ গুলোর একটা হচ্ছে ইচ্ছে ঘুড়ি। তখন মনে হত এই গতিতে লিখলে ইচ্ছে ঘুড়ি কে সংখ্যায় ছাড়িয়ে যাওয়া কোন ব্যাপার না। কিন্তু চাইলেই কি সব হয়? আস্তে আস্তে খেয়াল করলাম যখন তখন লেখার ইচ্ছে কমে আসছে, কমে আসছে লেখার মত ঘটনা সংখ্যাও। কারণ হিসেব করলে আমার প্রায় প্রতিটা দিনই অনেকটা আগের দিনের মত। সেই ঘুম থেকে উঠে ক্লাসে যাওয়া, আড্ডা, ঘোরাঘুরি, গল্প, ব্লগিং, বই পড়া ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রায়দিনই যেন ঘুরিফিরে একি জিনিসের একটু অন্য রকম ভাবে পুনরাবৃত্তি। হয়ত আমাদের জীবনটাও অনেকটা তাই। ঘুরেফিরে অনেকগুলো ছোটছোট পুনরাবৃত্তির একটা বড়সড় গল্প।

Advertisements

2 thoughts on “মন পবনের নাও ১২

  1. নিবিড় ভাই, আজকের পর্বটা অনেক বেশি ভালো লাগল। পরীক্ষার ফলাফলটায় নিজেকে এড়িয়ে গেলেও আঁচ পাচ্ছি আপনার সাফল্যের। অভিনন্দন নিবিড় ভাই।
    চুপিচুপি একটা কথা বলি, রাজনীতি আর ইতিহাস, দুইটাই আমার খুব পছন্দের বিষয় 😛
    শুভেচ্ছা।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s