রেবেকা

আজ রাতে শীত আসলেই বেশি পড়েছে, সামান্য এই চাদরে কিছুতেই মানতে চাইছে না। শীতে খাটের উপর রেবেকা কেমন গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে, দেখে মায়াই লাগে। আহারে মেয়েটা কত রাত না জানি, না ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। কম্বলটাও পুরান, পাতলা। রেবেকার শীত মানছে বলে মনে হয় না, কিন্তু শালা কিছুই করার নেই। বিয়ের পর মেজ ভাই যে নতুন কম্বলটা পাঠিয়েছিলেন করাচী থেকে বেশ ওম হত ওটাতে। কিন্তু সোলাইমানের বাচ্চা সব নিয়ে গেল। শখ করে বানানো সেগুন কাঠের টেবিল টা, বাবার আমলের সেই লোহার আলমারী , ঘরে থাকা মাত্র তোলা বেতনের টাকাটা, সব নিয়ে গেল। এমনকি নিয়ে গেল রেবেকাকে।

ভাইয়া বলেছিল কম্বলটা মারীতে শীতের সময় বেড়াতে গিয়ে কেনা, হবেও বা। গায়ে দিলেই কেমন যেন একটা আরাম লাগত। কত স্মৃতি ছিল কম্বলটাকে ঘিরে। আমাদের বিয়ে হয়েছিল ডিসেম্বরের শেষে, প্রচন্ড শীত তখন। প্রথম প্রথম কত উত্তেজনাই না ছিল কত রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছি এই কম্বলের তলে। কিন্তু এখন? নাকি সাত বছর হয়ে গেল বলে সময়ের সাথে ভালবাসাও ঝিমিয়ে পড়েছে। তা আবার কি করে হয়? নাইলে সোলায়মানকে গুলি করার সময় আমার হাত কাঁপত, এত পাহারার মধ্যে ঐ বাড়ীতে ঢুকতে আমার বুক কাঁপত।

রাতের বেলা সিগ্রেট টানতে একটা অন্য রকম মজা আছে । ধোয়ার সাথে সাথে মনে হয় মাথার সব চিন্তা হালকা হয়ে যায়। আজকে রাতে অনেক সিগ্রেটের দরকার ছিল, মাথাটা হালকা করার দরকার ছিল। কিন্তু আছে মাত্র তিনটা। এও বা কম কি, এই অকালের মাঝে একটা সিগ্রেট বা কয়জনের আছে, তাও বিদেশি সিগ্রেট।

আমি জানি এই ভাঙ্গাচোরা সময়ে, এই শহরে আমাকে নিয়ে অনেক গল্প। যার কিছুটা সত্য বেশিটা কল্পনা। তবে সবটাই আমার সাহসের গল্প। তবু কেন জানি মনে হয় সবাই হাসছে আড়ালে আবডালে, আমাকে নিয়ে, রেবেকা কে নিয়ে। আমার গল্প গুলো ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠছে রেবেকাকে ধরে নিয়ে যাবার গল্প, ওর হারান সময়ের গল্প, আমার রেবেকাকে ফিরে পাবার গল্প কিংবা আমাদের আবার একসাথে থাকার গল্প।

সত্য কিংবা মিথ্যা এই শহরে গল্পের কখনো অভাব হয়নি, না যুদ্ধের আগে, না যুদ্ধের পরে। আমাদেরও কি গল্পের অভাব পরেছিল? কতশত গল্প। আজকের গল্প কালকের গল্প কিংবা আগামী বছরের গল্প অথবা অনাগত সন্তানের গল্প। কি হবে তার নাম, কার ন্যাওটা হবে সে? এরকম কতই না গল্প। কিন্তু গল্প ছেড়ে বাস্তবের পৃথিবীতে নেমে আসেনি সে সন্তান। রাতের পর রাত আমরা আমাদের ব্যর্থতায় দুমড়ে গেছি মুচড়ে গেছি। চারিদিকের সন্তানহীনতার সন্দেহের তীর আমাদের বিদ্ধ করেছে, তবু আমাদের ভালবাসা আমাদের গল্প কে আগলে রেখেছি্‌ল, আমাদের স্ব্প্ন কে আকড়ে রেখেছিল।

ঠিক সেই সময় আমাদের ঝিমিয়ে আসা স্বপ্নের সমান্তরালে চারিদিকে জেগে উঠছিল আরেক নতুন স্বপ্ন। তার রেশ আমাদের এই ছোট শহরেও এসে লেগেছিল। চায়ের কাপ থেকে রাস্তার মিছিলে কিংবা শহরের একমাত্র কলেজে সবখানেই স্বপ্নবাজরা নতুন দিনের কথা নতুন দেশের কথা বলত। কিন্তু হঠাত একদিন সব পালটে গেল। শহরে নতুন আসা জলপাই রঙের ট্রাকের সাথে সাথে স্বপ্নবাজরা কেও মারা গেল কেওবা পালিয়ে গেল সাথে নিয়ে গেল স্বপ্নটা কে। কিন্তু আমরা আমাদের স্বপ্নটাকে আকড়ে রয়ে গেলাম এই মৃতপ্রায় শহরে।

আমরা রয়ে গেলাম কিন্তু পালটে গেল আমাদের পরিচিত শহর বদলে গেল আমাদের পরিচিত মানুষ গুলো। বাবার অতিপ্রিয় ছাত্র রহমানিয়া লাইব্রেরীর মালিক সোলায়মানের মাথায় রাতারাতি কিস্তি টুপি উঠে আসল। তার বাসার সামনে হাসি মুখে অনুগ্রহ প্রার্থীরা নতুন ভীড় তৈ্রি করল। কিন্তু বাজার কাপিয়ে ঠা ঠা করে হাসা বিজন কাকার হাসি হঠাৎ হারিয়ে গেল। প্রশ্ন করলেই বলত- ঘোর কলিকাল রে বাবা, ঘোর কলিকাল।

এতকিছুর পরেও আমরা আমাদের স্বপ্নকে আকড়ে ধরে রেখেছিলাম। কারফিউ মাখা রাতের শুনশান নীরবতার মাঝে আমারা ভাবতাম, আমাদের মাঝে আগামীতে এমন কেও হয়ত আসবে যে কিনা শত কারফিউ এর মাঝেও তার কান্নার স্বরে তার উপস্থিতি জানান দিবে।

কিন্তু হঠাৎ একদিন আমাদের বাসার সামনে সোলায়মানের কিস্তি টুপি দেখা দিল। আমার বুকশেলফের বই গুলো ধোয়ার সাথে আকাশে মিলিয়ে গেল, সাথে হারিয়ে গেল সেগুন কাঠের টেবিল টা কিংবা বাবার আমলের সেই লোহার আলমারী। আর আরো হারাল রেবেকা, জলপাই খাঁচার ভিতর। আমি তখন কিছুই করতে পারিনি কারন বিজন কাকার ভাষায়- ঘোর কলিকাল, চারিদিকে ঘোর কলিকাল।

স্বপ্ন হারান আমি নিজেকে হঠাৎ কয়েকদিন পর আবিষ্কার করি অন্য দেশে আমাদের শহরের পালাতক স্বপ্নবাজদের মাঝে। এইখানে কান পাতলেই খালি শুনা যায় লেফট রাইট, লেফট আর মাঝে চিৎকার- জোয়ান হুশিয়ার, কাধে অস্ত্র। আমিও মিশে যাই এই স্বপ্নবাজদের সাথে কিন্তু আমার স্বপ্ন থাকে ভিন্ন, রেবেকা কে ফিরে পাবার স্বপ্ন।

সেই সময়ের কতশত গল্প কতশত কথা আর কত দুঃসাহস। কিন্তু সব কিছুর পরেও আমার চোখে খালি ভাসে রেবাকা কে ফিরে পাবার দৃশ্য। নভেম্বরের এক শেষ রাতে দরজা ভেঙ্গে যখন আমরা ভিতরে ঢুকলাম তখন বেচারী হয়ত ভিতরের আর বাকি সবার মত ভেবেছিল সেই রোজকার মত আজো কাওকে নেওয়া হবে তারপর কয়েক ঘন্টা পর নিস্তেজ ভাবে হয়ত ফিরিয়েও দেওয়া হবে। তাই বাকি সবাই যখন আমাদের দেখে লজ্জায় নিজেকে লুকাতে ব্যস্ত তখনো রেবেকা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল কিন্তু কেন ওভাবে তাকিয়ে ছিল তা আর কখন জিজ্ঞেস করা হয় নি।

আসলে জিজ্ঞেস করা হয়ে উঠে নি। চারিদিকে তখন অনেক ব্যস্ততা, ঝড়ের বেগে তখন আমরা সামনে এগিয়ে চলছি আর তাই পরের কোন এক অলস সময়ের জন্য রেখে দিয়েছিলাম সেই প্রশ্ন। কিন্তু যেমন হঠাৎ করেই শুরু হয়েছিল ঠিক তেমনি হঠাৎ করেই শীতের এক বিকেল বেলা শেষ হয়ে গেল ব্যাপারটা। আর তাই স্বপ্নবাজরা তাদের দেশ ফেরত পেল, আমি পেলাম রেবেকা কে। কিন্তু রূপকথার গল্পের মত দৈত্যের মৃত্যুর পরেও শেষ হল না আমাদের গল্প।

শীতের প্রায় শেষ তখন, চারিদিকে সব ঠান্ডা হয়ে আসছে। আবার গল্প জমে উঠছে বাজারের চায়ের দোকানের সামনে। ঠিক সেই সময় কোন এক বিকেল বেলা বমির শব্দে রেবেকা জানান দিল নতুন এক খবর এর, আচমকা। হতভম্ব আমি তাকিয়ে থাকি রেবেকার দিকে আর বিজয়ের হাসি দিয়ে চাচী চিৎকার করে বলেন- আগেই কইছিলাম তোরে। নিস না, এমন মাইয়ারে ঘরে নিস না। বংশের মান ইজ্জত আর কিছুই থাকল না, পোড়া কপাল তোর। সেই সময় আমার দিকে তাকিয়ে এক দূর্বল হাসি দিল রেবেকা , বিস্মিত আমার জিজ্ঞেস করা হয় নি সেই হাসির কারণ। ঠিক একি ভাবে জিজ্ঞেস করা হয় নি অন্যদের হাসির কারণ, আমাকে দেখে বাজারের দোকানে গল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ।

কিন্তু আমার গল্প বা রেবেকার গল্প অথবা আমাদের নিয়ে গল্প আমার চারপাশে ক্রমশ এক দেওয়াল তুলতে শুরু করল। চারপাশের হাসির দেয়াল যেন বলতে চাইল- হয় নায় তোমারে দিয়ে সাত বছরে কিছুই হয় নায়। আমি যতই প্রতিবাদ করতে চাই ততই যেন এই দেয়াল বলে উঠে- তোমারে দিয়ে না হইলেও কিন্তু জানোয়ার গুলারে দিয়ে ঠিকি হইছে।

রাতের পর রাত আমি র্নিঘুম জেগে থাকি বিছানায় আর মাথার ভিতরে যেন ঘুরতে থাকে সারাদিনের হাসি গুলো। কিন্তু আমার পাশেই ঘুমিয়ে থাকে শ্রান্ত রেবেকা। আর আমার মাথার ভিতর ঘুরতে থাকে আমাদের পুরান সময়ের সব গল্প, আমাদের অনাগত সন্তানের জন্য গল্প, আমাদের ভালবাসার গল্প। রেবেকা সেই সব স্বপ্নের খুব কাছাকাছি কিন্তু আমি বুঝতে পারি সেই স্বপ্নে আমার কোন ভাগ নেই দায় নেই। বুকের ভিতর টা কেন জানি জ্বলতে থাকে অবিরাম রাতের পর রাত।

শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা রেবেকার শরীরের স্ফীত অংশ যেন জানান দেয় ভালবাসার আরেক অংশীদারের কথা। মাথার ভিতর ঘুরতে থাকা হাসি গুলো যেন জানান দেয় এই অংশীদারের জন্ম তোমার শরীর থেকে নয় বরং ভীনদেশি কোন শরীর থেকে। কিন্তু আরেকটা কে যেন জানান দেয় এই তো রেবেকা ঘুমিয়ে থাকা সেই শান্ত পুরান রেবেকা। আর তাই প্রতি রাতের মত মাথার ভিতর সব গুলিয়ে যায়।

হাতের শেষ হয়ে আসা আগুন জানান দেয় এইটাই শেষ সিগ্রেট কিন্তু শেষ হয় না মাথার ভিতর চিন্তা গুলো। ধোয়া গুলো ক্রমশ উড়ে যেতে থাকে সাথে আমি তাকিয়ে থাকি রেবেকার দিকে। রেবেকার হাল্কা শ্বাসের শব্দও যেন আমি টের পাই আর টের পাই আমার হাতের কাঁপন কিন্তু কে যেন মাথার ভিতর জানান দেয় সেই হাসির কথা। আর এলোমেলো হয়ে যায় বুকের ভিতর সব পরিকল্পনা। তবুও বা হাতে সিগ্রেট টাতে শেষ টান দিয়ে কাঁপতে থাকা ডান হাতে ধরা বালিশ হাতে শান্ত ভাবে ঘুমিয়ে থাকা রেবেকার দিকে তাকাই কারণ ব্যাপার টা শেষ করতে হবে, আজি।
আজ রাতে শীত আসলেই বেশি পড়েছে, সামান্য এই চাদরে কিছুতেই মানতে চাইছে না। শীতে খাটের উপর রেবেকা কেমন গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে, দেখে মায়াই লাগে। আহারে মেয়েটা কত রাত না জানি, না ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। কম্বলটাও পুরান, পাতলা। রেবেকার শীত মানছে বলে মনে হয় না, কিন্তু শালা কিছুই করার নেই। বিয়ের পর মেজ ভাই যে নতুন কম্বলটা পাঠিয়েছিলেন করাচী থেকে বেশ ওম হত ওটাতে। কিন্তু সোলাইমানের বাচ্চা সব নিয়ে গেল। শখ করে বানানো সেগুন কাঠের টেবিল টা, বাবার আমলের সেই লোহার আলমারী , ঘরে থাকা মাত্র তোলা বেতনের টাকাটা, সব নিয়ে গেল। এমনকি নিয়ে গেল রেবেকাকে।

ভাইয়া বলেছিল কম্বলটা মারীতে শীতের সময় বেড়াতে গিয়ে কেনা, হবেও বা। গায়ে দিলেই কেমন যেন একটা আরাম লাগত। কত স্মৃতি ছিল কম্বলটাকে ঘিরে। আমাদের বিয়ে হয়েছিল ডিসেম্বরের শেষে, প্রচন্ড শীত তখন। প্রথম প্রথম কত উত্তেজনাই না ছিল কত রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছি এই কম্বলের তলে। কিন্তু এখন? নাকি সাত বছর হয়ে গেল বলে সময়ের সাথে ভালবাসাও ঝিমিয়ে পড়েছে। তা আবার কি করে হয়? নাইলে সোলায়মানকে গুলি করার সময় আমার হাত কাঁপত, এত পাহারার মধ্যে ঐ বাড়ীতে ঢুকতে আমার বুক কাঁপত।

রাতের বেলা সিগ্রেট টানতে একটা অন্য রকম মজা আছে । ধোয়ার সাথে সাথে মনে হয় মাথার সব চিন্তা হালকা হয়ে যায়। আজকে রাতে অনেক সিগ্রেটের দরকার ছিল, মাথাটা হালকা করার দরকার ছিল। কিন্তু আছে মাত্র তিনটা। এও বা কম কি, এই অকালের মাঝে একটা সিগ্রেট বা কয়জনের আছে, তাও বিদেশি সিগ্রেট।

আমি জানি এই ভাঙ্গাচোরা সময়ে, এই শহরে আমাকে নিয়ে অনেক গল্প। যার কিছুটা সত্য বেশিটা কল্পনা। তবে সবটাই আমার সাহসের গল্প। তবু কেন জানি মনে হয় সবাই হাসছে আড়ালে আবডালে, আমাকে নিয়ে, রেবেকা কে নিয়ে। আমার গল্প গুলো ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠছে রেবেকাকে ধরে নিয়ে যাবার গল্প, ওর হারান সময়ের গল্প, আমার রেবেকাকে ফিরে পাবার গল্প কিংবা আমাদের আবার একসাথে থাকার গল্প।

সত্য কিংবা মিথ্যা এই শহরে গল্পের কখনো অভাব হয়নি, না যুদ্ধের আগে, না যুদ্ধের পরে। আমাদেরও কি গল্পের অভাব পরেছিল? কতশত গল্প। আজকের গল্প কালকের গল্প কিংবা আগামী বছরের গল্প অথবা অনাগত সন্তানের গল্প। কি হবে তার নাম, কার ন্যাওটা হবে সে? এরকম কতই না গল্প। কিন্তু গল্প ছেড়ে বাস্তবের পৃথিবীতে নেমে আসেনি সে সন্তান। রাতের পর রাত আমরা আমাদের ব্যর্থতায় দুমড়ে গেছি মুচড়ে গেছি। চারিদিকের সন্তানহীনতার সন্দেহের তীর আমাদের বিদ্ধ করেছে, তবু আমাদের ভালবাসা আমাদের গল্প কে আগলে রেখেছি্‌ল, আমাদের স্ব্প্ন কে আকড়ে রেখেছিল।

ঠিক সেই সময় আমাদের ঝিমিয়ে আসা স্বপ্নের সমান্তরালে চারিদিকে জেগে উঠছিল আরেক নতুন স্বপ্ন। তার রেশ আমাদের এই ছোট শহরেও এসে লেগেছিল। চায়ের কাপ থেকে রাস্তার মিছিলে কিংবা শহরের একমাত্র কলেজে সবখানেই স্বপ্নবাজরা নতুন দিনের কথা নতুন দেশের কথা বলত। কিন্তু হঠাত একদিন সব পালটে গেল। শহরে নতুন আসা জলপাই রঙের ট্রাকের সাথে সাথে স্বপ্নবাজরা কেও মারা গেল কেওবা পালিয়ে গেল সাথে নিয়ে গেল স্বপ্নটা কে। কিন্তু আমরা আমাদের স্বপ্নটাকে আকড়ে রয়ে গেলাম এই মৃতপ্রায় শহরে।

আমরা রয়ে গেলাম কিন্তু পালটে গেল আমাদের পরিচিত শহর বদলে গেল আমাদের পরিচিত মানুষ গুলো। বাবার অতিপ্রিয় ছাত্র রহমানিয়া লাইব্রেরীর মালিক সোলায়মানের মাথায় রাতারাতি কিস্তি টুপি উঠে আসল। তার বাসার সামনে হাসি মুখে অনুগ্রহ প্রার্থীরা নতুন ভীড় তৈ্রি করল। কিন্তু বাজার কাপিয়ে ঠা ঠা করে হাসা বিজন কাকার হাসি হঠাৎ হারিয়ে গেল। প্রশ্ন করলেই বলত- ঘোর কলিকাল রে বাবা, ঘোর কলিকাল।

এতকিছুর পরেও আমরা আমাদের স্বপ্নকে আকড়ে ধরে রেখেছিলাম। কারফিউ মাখা রাতের শুনশান নীরবতার মাঝে আমারা ভাবতাম, আমাদের মাঝে আগামীতে এমন কেও হয়ত আসবে যে কিনা শত কারফিউ এর মাঝেও তার কান্নার স্বরে তার উপস্থিতি জানান দিবে।

কিন্তু হঠাৎ একদিন আমাদের বাসার সামনে সোলায়মানের কিস্তি টুপি দেখা দিল। আমার বুকশেলফের বই গুলো ধোয়ার সাথে আকাশে মিলিয়ে গেল, সাথে হারিয়ে গেল সেগুন কাঠের টেবিল টা কিংবা বাবার আমলের সেই লোহার আলমারী। আর আরো হারাল রেবেকা, জলপাই খাঁচার ভিতর। আমি তখন কিছুই করতে পারিনি কারন বিজন কাকার ভাষায়- ঘোর কলিকাল, চারিদিকে ঘোর কলিকাল।

স্বপ্ন হারান আমি নিজেকে হঠাৎ কয়েকদিন পর আবিষ্কার করি অন্য দেশে আমাদের শহরের পালাতক স্বপ্নবাজদের মাঝে। এইখানে কান পাতলেই খালি শুনা যায় লেফট রাইট, লেফট আর মাঝে চিৎকার- জোয়ান হুশিয়ার, কাধে অস্ত্র। আমিও মিশে যাই এই স্বপ্নবাজদের সাথে কিন্তু আমার স্বপ্ন থাকে ভিন্ন, রেবেকা কে ফিরে পাবার স্বপ্ন।

সেই সময়ের কতশত গল্প কতশত কথা আর কত দুঃসাহস। কিন্তু সব কিছুর পরেও আমার চোখে খালি ভাসে রেবাকা কে ফিরে পাবার দৃশ্য। নভেম্বরের এক শেষ রাতে দরজা ভেঙ্গে যখন আমরা ভিতরে ঢুকলাম তখন বেচারী হয়ত ভিতরের আর বাকি সবার মত ভেবেছিল সেই রোজকার মত আজো কাওকে নেওয়া হবে তারপর কয়েক ঘন্টা পর নিস্তেজ ভাবে হয়ত ফিরিয়েও দেওয়া হবে। তাই বাকি সবাই যখন আমাদের দেখে লজ্জায় নিজেকে লুকাতে ব্যস্ত তখনো রেবেকা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল কিন্তু কেন ওভাবে তাকিয়ে ছিল তা আর কখন জিজ্ঞেস করা হয় নি।

আসলে জিজ্ঞেস করা হয়ে উঠে নি। চারিদিকে তখন অনেক ব্যস্ততা, ঝড়ের বেগে তখন আমরা সামনে এগিয়ে চলছি আর তাই পরের কোন এক অলস সময়ের জন্য রেখে দিয়েছিলাম সেই প্রশ্ন। কিন্তু যেমন হঠাৎ করেই শুরু হয়েছিল ঠিক তেমনি হঠাৎ করেই শীতের এক বিকেল বেলা শেষ হয়ে গেল ব্যাপারটা। আর তাই স্বপ্নবাজরা তাদের দেশ ফেরত পেল, আমি পেলাম রেবেকা কে। কিন্তু রূপকথার গল্পের মত দৈত্যের মৃত্যুর পরেও শেষ হল না আমাদের গল্প।

শীতের প্রায় শেষ তখন, চারিদিকে সব ঠান্ডা হয়ে আসছে। আবার গল্প জমে উঠছে বাজারের চায়ের দোকানের সামনে। ঠিক সেই সময় কোন এক বিকেল বেলা বমির শব্দে রেবেকা জানান দিল নতুন এক খবর এর, আচমকা। হতভম্ব আমি তাকিয়ে থাকি রেবেকার দিকে আর বিজয়ের হাসি দিয়ে চাচী চিৎকার করে বলেন- আগেই কইছিলাম তোরে। নিস না, এমন মাইয়ারে ঘরে নিস না। বংশের মান ইজ্জত আর কিছুই থাকল না, পোড়া কপাল তোর। সেই সময় আমার দিকে তাকিয়ে এক দূর্বল হাসি দিল রেবেকা , বিস্মিত আমার জিজ্ঞেস করা হয় নি সেই হাসির কারণ। ঠিক একি ভাবে জিজ্ঞেস করা হয় নি অন্যদের হাসির কারণ, আমাকে দেখে বাজারের দোকানে গল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ।

কিন্তু আমার গল্প বা রেবেকার গল্প অথবা আমাদের নিয়ে গল্প আমার চারপাশে ক্রমশ এক দেওয়াল তুলতে শুরু করল। চারপাশের হাসির দেয়াল যেন বলতে চাইল- হয় নায় তোমারে দিয়ে সাত বছরে কিছুই হয় নায়। আমি যতই প্রতিবাদ করতে চাই ততই যেন এই দেয়াল বলে উঠে- তোমারে দিয়ে না হইলেও কিন্তু জানোয়ার গুলারে দিয়ে ঠিকি হইছে।

রাতের পর রাত আমি র্নিঘুম জেগে থাকি বিছানায় আর মাথার ভিতরে যেন ঘুরতে থাকে সারাদিনের হাসি গুলো। কিন্তু আমার পাশেই ঘুমিয়ে থাকে শ্রান্ত রেবেকা। আর আমার মাথার ভিতর ঘুরতে থাকে আমাদের পুরান সময়ের সব গল্প, আমাদের অনাগত সন্তানের জন্য গল্প, আমাদের ভালবাসার গল্প। রেবেকা সেই সব স্বপ্নের খুব কাছাকাছি কিন্তু আমি বুঝতে পারি সেই স্বপ্নে আমার কোন ভাগ নেই দায় নেই। বুকের ভিতর টা কেন জানি জ্বলতে থাকে অবিরাম রাতের পর রাত।

শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা রেবেকার শরীরের স্ফীত অংশ যেন জানান দেয় ভালবাসার আরেক অংশীদারের কথা। মাথার ভিতর ঘুরতে থাকা হাসি গুলো যেন জানান দেয় এই অংশীদারের জন্ম তোমার শরীর থেকে নয় বরং ভীনদেশি কোন শরীর থেকে। কিন্তু আরেকটা কে যেন জানান দেয় এই তো রেবেকা ঘুমিয়ে থাকা সেই শান্ত পুরান রেবেকা। আর তাই প্রতি রাতের মত মাথার ভিতর সব গুলিয়ে যায়।

হাতের শেষ হয়ে আসা আগুন জানান দেয় এইটাই শেষ সিগ্রেট কিন্তু শেষ হয় না মাথার ভিতর চিন্তা গুলো। ধোয়া গুলো ক্রমশ উড়ে যেতে থাকে সাথে আমি তাকিয়ে থাকি রেবেকার দিকে। রেবেকার হাল্কা শ্বাসের শব্দও যেন আমি টের পাই আর টের পাই আমার হাতের কাঁপন কিন্তু কে যেন মাথার ভিতর জানান দেয় সেই হাসির কথা। আর এলোমেলো হয়ে যায় বুকের ভিতর সব পরিকল্পনা। তবুও বা হাতে সিগ্রেট টাতে শেষ টান দিয়ে কাঁপতে থাকা ডান হাতে ধরা বালিশ হাতে শান্ত ভাবে ঘুমিয়ে থাকা রেবেকার দিকে তাকাই কারণ ব্যাপার টা শেষ করতে হবে, আজি।

ফুটনোটঃ পুরান একটা গল্প তবে নতুন করে আবার এইখানে দিলাম।

Advertisements

6 thoughts on “রেবেকা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s