বইমেলার গল্প- ক

ফ্রেবুয়ারী মাস কে নানা কারণে ভালু পাই এরমধ্যে অন্যতম হল বইমেলা। বইমেলা কে কেন ভালু পাই এই জাতীয় কাউন্টার ন্যারেটিভ ডির্সকোর্সে না গিয়ে শুধু এইটুকু বলতে পারি নতুন বইয়ের গন্ধ ভাল লাগে, মানুষ বই কিনছে এইটা দেখে ভাল লাগে। আর এত এত নতুন বই আর নতুন বই কেনা মানুষ বইমেলা ছাড়া কই পাওয়া যাবে বলেন তাই বইমেলা ভা্লু লাগে।

বইমেলা আজকে থেকে শুরু হল। অন্যদিন সন্ধ্যায় আড্ডা হয় কোঞ্চিপায় বা সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে কিন্তু আজকে সেসব বাদ। তাই সন্ধ্যায় আস্তে আস্তে হেটে হেটে এগার নাম্বার বাসে রওনা দিলাম। মাঝখানে সুহান মিয়া ফোন দিল, সেও নাকি বইমেলা তবে আসতে একটু দেরি হবে। ফোনদিয়ে দেখি অন্যকেউ আজকে এখনো আসে নি তাই ভাবলাম পাবলিক লাইব্রেরিতে একটু সময় কাটিয়ে যাই এরমধ্যে অন্যরাও এসে যাবে। এরমধ্যে পাবলিক লাইব্রেরির সিড়িতে এক জোড়া বালক-বালিকার কথা থেকে জানা গেল আজকে অমর্ত্য সেন নাকি এসেছিল বইমেলার উদ্বো্ধনী অনুষ্ঠানে। শুনে প্রথমে মনে হল, আরে আগে জানলে তো অনুষ্ঠানে আসা যেত। অমর্ত্য সেনের বক্তৃতা শোনা যেত। তবে একটু পরেই মনে আসল আগে জানলেও কিছু লাভ হত না কারণ প্রধানমন্ত্রী যে অনুষ্ঠানে সেখানে আমার মত ম্যাংগো পাবলিকের ঢোকার অনুমতি থাকত না।

ঠিক সাতটার সময় সুহান মিয়া কে নিয়ে টিএসসির পাশ দিয়ে বইমেলা ঢোকার সময় প্রথম যে জিনসটা দেখে বিরক্তি লাগল সেটা হল বাংলা একাডেমির বাইরের রাস্তায় এইবারো স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই স্টল গুলো নিয়ে মনের ভিতর একটা খচখচানি থাকে কারণ এই স্টল গুলোর বেশিরভাগ মনে হয় দলীয় বিবেচনায় দেওয়া হয়। দোকান গুলোর ভিতরের বই গুলো দেখলে বোঝা যায় এইগুলো মুরগী প্রকাশনী। সারা বছর এদের কোন খোজ খবর থাকে না শুধু বইমেলার সময় এদের হাকডাক দেখা যায় যাদের ডিসপ্লেতে লীগ সময়ে সামনে থাকে “ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার” আর বিএনপি থাকলে ডিসপ্লেতে থাকবে “খাল কাটার ইতিহাস”। আর এইসব বইয়ের জোড়েই এরা বইমেলায় প্রতিবার স্টল পেয়ে যাবে আর জায়গা কমবে সত্যিকারের প্রকাশনী গুলোর।

মেলায় ঢুকেই প্রথম হাতের বাম পাশ দিয়ে শুরু করলাম। দুইজনেই গরীব ছাত্র তাই স্টলে স্টলে বই উলটাই আর মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পরের স্টলে যাই। ঘুরতে ঘুরতে দেখি বেশ কিছু স্টলে এখনো অনেক কাজ বাকি তাই সাজসজ্জার কাজ চলছে আর অনেক স্টলেই ফিনিশিং টাচ দিচ্ছে। স্টলের কাজ ঠিকমত শেষ হয় নি বলেই হয়ত দোকান গুলো সামনের ধুলাবালি নিয়ে বেশি চিন্তা করে নি। তবে শেষের দিকে তথ্যকেন্দ্রের দিকে কিছু দোকান দেখলাম দোকানের সামনের বালুময় অংশটা ম্যাট দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে। এইসব দেখতে দেখতে নজরুল মঞ্চের সামনে গিয়ে দেখি জায়গাটা পুরাই ফাকা। সম্ভবত মেলার প্রথম দিন দেখেই কেউ আর মোড়ক উন্মোচনের দিকে যায় নি। অবশ্য দিন কতেক পর বিশেষ করে ছুটির দিন গুলোতে মোড়ক উন্মোচনের জন্য নজরুল মঞ্চে্র দখল নিয়ে ধাক্কা-ধাক্কিটা দেখার মত হয়। আজকে অবশ্য কেউ নেই শুধু এক জোড়া অল্প বয়স্ক স্বা্মী-স্ত্রী আর তাদের ছোট বাচ্চাটা ছাড়া। তিন জনেই ছবি তুলতে ব্যস্ত। কাজকর্ম নেই দেখে আমরা দুই জনে তাদের কাজকাম দেখলাম কিছুক্ষণ। সুহান দাবি করল স্বা্মী-স্ত্রীর বয়স নির্ঘাত আমার থেকে সামান্য একটু বেশি হবে। ভাল করে খেয়াল করে মনে হল সুহান মিয়া কথাটা মিথ্যা বলে নাই। এদের কাজকর্ম আর পিচ্চি বাচ্চাটার হাসি দেখে মনে হল অল্প বয়সে বিয়ে করা খুব একটা খারাপ কাজ না 😀

আগেই বলছি গরীব ছাত্র দেখে স্টলে স্টলে বই উলটানো আর চারপাশের মানুষ দেখা ছাড়া তেমন কোন কাজ ছিল না তবে মুক্তধারার স্টলের সামনে গিয়ে মনে হল দুনিয়ায় ইনসাফ বলে একটা জিনিস এখনো রয়ে গেছে। এদের কিছু কিছু পুরাতন বইয়ের দাম এত কম যেন মনে হয় এরা সরাসরি সত্তরের দশক থেকে উঠে এসেছে। খুজতে খুজতে মুক্তধারাতে পাওয়া গেল শহীদুল জহিরের “পারাপার”। একদম প্রথম এডিশন যখন শহীদুল জহির লিখতেন শহীদুল হক নামে। মলাটের উপর কাল কালিতে ছোট করে লেখা শহীদুল হক। দাম কত জানেন? মাত্র ১৫ টাকা। সুহান বই কিনল তিনটা তাও দাম ৯০ টাকার উপর উঠাতে পারল না। আহা, সব প্রকাশনী যদি এইভাবে দাম নিত।

মেলায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাত দেখা হয়ে গেল খেকশিয়াল’দার সাথে। ওনাকে নিয়েই এরপর শুরু হল ঘোরাঘুরি। ঘুরতে ঘুরতে হাজির হলাম শুদ্বস্বরের সামনে। দেখি টুটুল ভাই আর সামিয়া বেগম দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই টুটুল ভাই বলে কোঞ্চিপার লোকেরা খ্রাপ তারা তেমন একটা বইটই কিনে না। তা বইয়ের দাম কেন এত বেশি এই নিয়ে উত্তরাধুনিক আলোচনা করতে করতে শুদ্ধস্বরের ডিসপ্লেতে গিয়ে দেখি হয়রান আবীরের বই এসে গেছে। বইটার মলাট সুন্দর।উল্টে পালটে দেখতে দেখতে দাম দেখে অন্যদিন কিনব বলে ফাকি দিয়ে অন্যপাশে চলে গেলাম। তবে ছোটগল্প ভাল লাগে বলে আবদুল মান্নান সৈয়দের বুদ্ধদেব বসুর উপর বইটা না কিনে ছোট গল্পের বই “উৎসব” কিনে ফেললাম শুদ্ধস্বর থেকে। তবে শুদ্ধস্বরের যেটা সবচেয়ে ভাল লাগল সেটা হল স্টল। পুরা মেলা ঘুরে প্রথম দিন শেষে মনে হল এইবারের মেলায় সবচেয়ে ছিমছাম সুন্দর দুই-তিনটা স্টলের একটা শুদ্ধস্বর।

খেকশিয়াল’দার সাথে ঘুরতে ঘুরতে বহু কিছু নিয়েই কথাবার্তা হল। নওরোজ কিতাবিস্তানের সামনে এসে কথা উঠল সত্যজিত আর ফেলুদা নিয়ে। নওরোজে সত্যজিতের শুটিং নিয়ে একটা বই আছে সেটা উল্টাতে উল্টাতে কথা উঠল “জয় বাবা ফেলুনাথ” আর মগনলাল মেঘরাজ ওরফে উত্তপল দত্ত নিয়ে। ঐ সিনেমায় জটায়ু কে নিয়ে সেই ছুরির খেলার কথাও হল কিছুক্ষণ। তারপর হোমস, ওয়াটসন আর প্রফেসর মরিয়ার্টিকে নিয়েও হল একদফা। খেয়াল করে দেখলাম আমি লোক খ্রাপ কারণ মগনলাল আর মরিয়ার্টি দুই জনকেই আমি ভালু পাই।

আজকে মেলায় সবচেয়ে ভাল যে জিনিসটা লাগছে সেটা হল মেলার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। যতক্ষণ ছিলাম সারাটা সময় মাইকে “একটুকু ছোয়া লাগে” এই সুরটা বাজছিল। এই গানটা এমনিতেই ভাল লাগে তাই গতবারের মাইকের অত্যাচার তুলনায় তাই এইবার এটা মধু মনে হচ্ছিল।


বহু গল্প হল আজকে আর না। আরেকদিন কথা হবে তবে সেটা “খ” তে।

Advertisements

6 thoughts on “বইমেলার গল্প- ক

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s