বইমেলার গল্প- গ


আজকে মেলার প্রথম বৃহস্পতিবার। সাধারণত বই মেলাতে সবচেয়ে বেশি ভীড় হয় বৃহস্পতি, শুক্র আর শনিবার। সেই হিসেবে এইবারের মেলায় আজকে ছিল ভীড় শুরু হওয়ার জন্য প্রথমদিন। মেলা শুরুর সপ্তাহ বলে দারুণ ভীড় না হলেও খুব একটা খারাপ ছিল না লোকসংখ্যা। আজকে যেতে যেতে একটু দেরি হয়ে গেল, প্রায় সোয়া সাতটা। শাহবাগ থেকে হেটে হেটে মেলায় যাওয়ার পথে অনেককেই দেখলাম মেলা থেকে ফিরে যাচ্ছে। অনেকে দলবেধে, অনেকে জোড়ায় জোড়ায় আবার অনেকে শুধুই একা। কার হাতে বই আছে আবার কার হাত খালি আবার কার হাতে মেলার বাইরে বিক্রি হওয়া টুকটাক জিনিস। খেয়াল করে দেখলাম যারা বের হচ্ছে তাদের অধিকাংশের হাতে বই নেই, অবশ্য বলা যায় অনেকেই বই কেনে মেলার শেষের দিকে এবং সেটাও একটা কারণ হতে পারে মানুষের হাতে বই কম থাকার। তবে অনান্যবার আমার পর্যবেক্ষণ থেকে এটা দেখেছি মেলার শেষের দিকেও যত লোক মেলা থেকে বের হয় তাদের অধিকাংশের হাতে বই থাকে না। আসলে যত মানুষ বই কিনতে আসে তার থেকে বেশি মানুষ আসে ঘুরতে।


আজকে বই কেনা নিয়ে একটা মজার ঘটনা ঘটল। সাধারণত বেশ কয়েকজনে মিলে বইমেলায় ঘুরলে বই দেখার চেয়ে আড্ডা হয় বেশি তাই মেলার প্রথমে নিজে নিজে অনেকক্ষণ ঘুরলাম। ঘুরতে ঘুরতে শুদ্ধস্বর স্টলে এসে বই দেখছি। সহ সচল অনেকের বই আছে এইখানে, সেই বইগুলোই উলটে পালটে দেখছিলাম কে কে কী লিখেছে। এর মধ্যে দেখলাম স্টলের ভিতর একলোক বসে আছে। চেনা চেনা মনে হয় কিন্তু কই দেখেছি ঠিক মনে করতে পারছি না। বেশ কিছুক্ষণ বইটই দেখে অন্যদিকে হাটা দিলাম। মাঝখানে তারেক ভাইদের সাথে দেখা হওয়ায় এই কথা সেই কথা থেকে স্টলে বসে থাকা লোকটার কথা বললাম। এটা শুনেই তারেক ভাই বলল, আরে উনি আহমদ মোস্তফা কামাল। আহমদ মোস্তফা কামালের নাম আমি প্রথম শুনছিলাম নজরুল ভাইয়ের কাছ থেকে। কী প্রসংগে জানি উনি বলছিলেন- এই লোকের লেখা পইড়েন মিয়া। এরপর নজু ভাইয়ের থেকে নিয়েই পড়া হয়ছিল উনার “ঘর ভরতি মানুষ অথবা নৈঃশব্দ”। ছোট গল্পের বই। এরপর পড়া হয়েছে তার “সংশয়দীর ঈশ্বর”। যদিও বাংলাদেশে আহমদ মোস্তফা কামাল তেমন পরিচিত কোন লেখক না কিন্তু তার এই দুইটা বই পড়ার পর থেকেই আমি তার লেখা পছন্দ করা শুরু করছি। গল্প কিংবা প্রবন্ধ যেকোন খানেই সহজ করে কথা বলার তার স্টাইলটা আমার ভাল লাগে। তাই আবার দৌড় দিলাম শুদ্ধস্বরে। সেখান থেকে তার নতুন বই “অশু ও রক্তপাতের গল্প” বইটা নিয়ে সামনে দিলাম অটোগ্রাফের জন্য। অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে উনি নাম জানতে চাইলেন, নাম বললাম নিবিড় এবং সংগে সংগে এর আগে শতবার শোনা প্রশ্নটা আবার শুনলাম- আপনার নাম কি আসলেই নিবিড়? আহারে এত কষ্ট করে আমার মায়ে নাম রাখল নিবিড় কিন্তু কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। যাই হোক অটোগ্রাফ দেওয়ার পর আবার প্রশ্ন করল আপনার আসল নাম কী? এইবার বুঝলাম যতই বলি উনি বিশ্বাস করেন নাই।


এই দুইদিন খেয়াল করি নাই আজকে করলাম। মেলায় ঘোষণা মঞ্চের ঠিক সামনে যাকে বলে মেলার একটা কী-স্পটে স্টল দেওয়া হয়েছে বসুন্ধরা পেপার কে। এইটার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝলাম না। স্টলে বসুন্ধরা পেপারের পেপার আছে আর টিস্যু। এই দুই জিনিস থাকলে যে মেলায় স্টল পাওয়া যায় এবং এমন দারুণ একটা জায়গায় এইটা জানা ছিল না। পরে কয়েকজন কে প্রশ্ন করে জানা গেল গত বছরও নাকি ঠিক একি জায়গায় বসুন্ধরা পেপারের স্টল ছিল। বুঝলাম কথা ঠিক, এযুগে টাকাই ঈশ্বর।


প্রতিবার মেলা আসলে কিছু মুক্তিযুদ্ধের উপর বই কিনি। তবে হাতে টাকা কম থাকে তাই এই বইগুলো কেনার আগে ভাল ভাবে মেলা ঘুরে দেখি, মেলার শেষ দিকে সিন্ধান্ত নিই আসলে কোন বইগুলা কিনব। ঘুরতে ঘুরতে আজকে সুহান আর ওসেরিস এর সাথে এক স্টলে দেখা তারাও মুক্তিযুদ্ধের উপর বই কিনবে তাই তিন জনে মিলেই ঘোরা শুরু করলাম। তবে স্টলে ঘুরে আগেই অনুভূতিটাই হল, মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা বই গুলোর দাম একটু বেশি। ছাত্রদের পক্ষে এই বইগুলো আসলেই কেনা একটু কষ্টকর। অবশ্য জানি উপায় নেই তাও যদি কোনভাবে শুধু এই ক্যাটাগরির বইগুলোর দাম কমানো যেত তবে বেশ ভালই হত। আর এখানে আরেকটা সমস্যা হয় বইগুলা অনেক স্টলে ছড়ানো ছিটানো তবে এদিক দিয়ে সবচেয়ে ভাল কাজ করেছেন মেজর কামরুল হাসান ভূয়ঞা (বীর প্রতীক)। প্রতিবার মেলায় তার একটা স্টল থাকে এইবারো আছে যেখানে বিভিন্ন প্রকাশনীর মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা ভাল বই গুলোই শুধু বিক্রি হয়। এই স্টলে গেলে অনেক স্টল ঘোরার কষ্ট অনেক কমে যায়। তবে আফসোসের কথা হচ্ছে এই স্টল এমন এক চিপায় যেখানে এইটা খুজে পাওয়াই মুশকিল অবশ্য সমস্যা নেই এই স্টল খুজেতে খুজতে হয়রান হলে লোকজন মেলার প্রানকেন্দ্রে গিয়ে বসুন্ধরা টিস্যু থেকে টিস্যু কিনে সতেজ মনে বাড়ী যেতে পারবে।


বাংলা একাডেমির পুকুরের পাশে একাডেমির নতুন বিল্ডিং হচ্ছে। কাজ মনে হয় অনেকটাই শেষ। দেখেটেখে মনে হয় বেশ সুন্দর হবে বিল্ডিংটা। তবে আসল কথা এইটা না আসল কথা হল একাডেমির পুকুরের এখন একটা বাধানো সিড়ি আছে। বসার জন্য এটা একটা চমৎকার জায়গা। ঘোরাঘুরি শেষে এই জায়গায় চুপচাপ বিশ্রাম নেওয়া যায় আর কয়েকজন থাকলে চমৎকার একটা আড্ডাও দেয়া যায়। গোপন খবরে প্রকাশ আজকে নাকি বহু সচল এই জায়গায় গোপনে আড্ডা দিছে এবং সেই আড্ডা শেষে তাদের শিববাড়িতে চা সাথে কিছু টা সহযোগে দেখা গেছে। এই চা চক্রের সময় এবং তার পরে অনেককেই বলতে শোনা গেছে মেলায় নাকি বইয়ের সাথে সাথে আর অনেক কিছুই দেখার আছে। বইমেলায় বই ছাড়া আর কী দেখার আছে আমি অবশ্য তা ধরতে পারি নাই তবে ক্লু হিসেবে জনৈক বড় ভাই বলছে গতকালের হট ফ্যাক্টর এবং এই দেখা ও শোনা এক সাথে জড়িত


আজকে যত সচলের সাথে দেখা হল সবার হাতেই মুক্তধারা থেকে কেনা কোন না কোন বই দেখা গেছে, এমন কী এক সচল মুক্তধারার মত জায়গা থেকে ১২০০/১৩০০ টাকার বিল তুলতে সক্ষম হয়েছেন। এইসব দেখে ভাবছি মুক্তধারার লোকদের গিয়ে বলব ভাই সচলের লোকদের একটা স্পেশাল ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।


বইমেলায় যে কত অদ্ভুত নামের বই পাওয়া যায় তার ঠিক নাই। এইসব অদ্ভুত নামের বইগুলোর ভিতর থেকে একটা বইয়ের নাম আজকে না বলে পারছি না, সেটা হল- “লালাটিকস”। আমার আস্থা আছে আপনারা সবাই বুদ্ধিমান এবং বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই যথেষ্ঠ তাই আশা করি কেন বলছি ধরতে পারছেন


আজকে যেসব সচল মেলায় আসছিল তাদের একটা তালিকা দিয়ে দেই- পান্ডব দা, টুটুল ভাই, ওডিন’দা, সিমন ভাই, পান্থ’দা, গৌতম’দা, লীলেন ভাই, সবজান্তা ভাই, আশরাফ ভাই, তারেক ভাই, সুহান, খেকশিয়াল দা, ওসেরিস, রায়হান আবীর। আর কেউ এসে থাকতে পারেন তবে আমার চোখে পরেন নাই তবে নজরুল ভাই মেলা খেলাপী। গত পোস্টে দেখলাম বলছেন আজকে আসবেন তবে এখনো পর্যন্ত উনার উপস্থিতির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না


এক ধাক্কায় বহুত কথা হয়ে গেল, এলা ক্ষ্যান্ত দিলাম

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s