বইমেলার গল্প- ঘ


হরতাল খারাপ জিনিস তবে এর একটা ভাল দিকও আছে। হরতাল থাকলে সকালবেলা ক্লাসে দৌড়ানোর ভয় থাকে না, দুই মিনিট দেরি করে আসলে স্যারের ক্লাস থেকে বের করে দেওয়ারো ভয় থাকে না তাই ইচ্ছে মত ঘুমান যায়। আজকে সারাদিন এইরকম ঘুমটুম দিয়ে যখন মেলার উদ্দ্যেশে এগার নাম্বার বাসে রওনা দিলাম তখন প্রায় সন্ধ্যা। রাস্তায় হাটতে হাটতে দেখি গাড়িঘোড়া খুব কম, বলা যায় ঢাকার রাস্তায় অন্য সন্ধ্যার তুলনায় আজকে প্রায় গাড়ি নেই বললেই চলে। এইসব দেখে বুঝলাম আজকে মেলায় লোক কম হবে কিন্তু টিএসসির সামনে এসে দেখি ঘটনা উলটা। বিশাল এক লম্বা লাইন। মেলার শুরুর দশদিনে সাধারণত অফিস ডে’তে লাইন দিয়ে ঢুকতে হয় না আজকে হচ্ছে। সবাই মনে হয় আমার মত সারাদিন বাসায় বসে বসে বিরক্ত হয়ে সন্ধ্যায় বের হবার সুযোগ পেয়েই প্রথমে বইমেলায় হাজির হয়েছে। হাটতে হাটতে একদম সামনে এসে বুঝলাম ঘটনা কী, পুরা মেলায় ঢুকার জন্য সিকিরিউটি আর্চওয়ে রাখা হয়েছে মাত্র একটা তাই লাইন বড় হয়ে গেছে. এতবড় একটা মেলায় ঢুকার রাস্তা কী হিসেবে একটা রাখা হয়েছে বুঝলাম না। তবে ভিতরে ঢুকে একটু হাটাহাটি করতেই বুঝলাম আজকে হরতালের তুলনায় লোক সমাগম আসলেই অনেক ভাল বলা যায়। বিটিভির আটটার সংবাদের ভাষায় বললে বলতে হয়, বাংলাদেশের আপামর সাধারণ জনতা মেলায় উপস্থিত থেকে জানান দিয়েছে তারা এই হরতাল প্রত্যাখ্যান করেছে 😛


বইমেলার যে জিনস টা খুব ভাল লাগে তার অন্যতম হচ্ছে মানুষজনের সাথে দেখা সাক্ষাত হওয়া। এই শহরে রাস্তায় জ্যাম, অফিসের হাংগামা ইত্যাদি নানা কারণে পরিচিত অনেকের সাথে বছরের অনান্য সময়ে খুব একটা দেখা হয় না বলা যায় কিন্তু এই সময় টা আলাদা। যার যত ব্যস্ততাই থাকুন না কেন সবাই চেষ্টা করে বইমেলায় আসার জন্য সময় বের করার। আর আমার মত যারা কাজ নেই বলে প্রায় সন্ধ্যায় মেলায় পরে থাকে তাদের সাথে তখন তাই অনেকের দেখা হয়ে যায়। একটা উদাহারণ দিয়েই খোলাসা করি, আমার দুই বন্ধু যাদের একজন চাকুরীসূত্রে ঢাকার বাইরে থাকে আর আরেকজন থাকে ঢাকার অন্যপ্রান্তে। এই দুইজনের সাথে আমার বছরে ছ’মাসে ন’মাসে এক দুইবার দেখা হয়। সন্ধ্যায় সাধারণত ক্যাম্পাসে আড্ডা দিই কিন্তু কোটি টাকার অফার দিলেও এই দুইজনকে সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে আনা যাবে না। এই শুক্রবার দুইজনে মিলে ফোন দিল, বলে তাড়াতাড়ি চলে আয় আড্ডা হইবেক। আমি বললাম, বইমেলায় চলে আয় সেখানে আড্ডা হইবেক। অন্যসময় কোটি টাকার অফারেও যা হয় না এইবার তা এক কথাতেই হয়ে গেল কারণ দুইজনেই বই ভালবাসে।


আজকে মেলায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ কথা উঠল নজরুল ভাই কই। এইটা বলতে না বলতেই দেখি একটু দূরে বাংলা একাডেমির ঘোষণা মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নজরুল ভাই, নপূর ভাবী আর নিধি। এর মধ্যে কে যেন একজন বলে উঠল লোকটা অনেকদিন বাঁচবে। তা এই সুসংবাদ দেওয়ার জন্যে সামনে এগিয়ে যেতেই একটা চমৎকার আড্ডা জমে গেল। আড্ডা দিতে দিতেই ঘোষণা মঞ্চের সিড়িতে নজরুল ভাইয়ের ক্যামেরায় জনাকয়েক সচলের একটা ফটোসেশনও হয়ে গেল তবে নজরুল ভাই সেই ছবি দিলে সেই ছবিতে আমাকে খোজা নিরর্থক কারণ আমি তখন একটু দূরে দাঁড়িয়ে কে কী স্টাইলে ছবি তুলে সে ঘটনা পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত ছিলাম। এইসবের মাঝেই আবার কে জানি বলল রিটন ভাই নাকি মেলাতে আছে, বলতে না বলতেই দেখি রিটন ভাই হাজির। বুঝলাম আজকে যার নাম নেওয়া হবে তিনিই হবেন দীর্ঘজীবী। এর মধ্যে সচল নাহার মনিকাও হাজির হলেন, আজকেই নাকি মেলাতে তার নতুন বই এসেছে। এই আড্ডার পুরা বিবরনী অবশ্য আমার কাছে নাই কারণ আড্ডার মাঝেই কম দামে বই কেনার আশায় আমরা জনা কয়েক হানা দিয়েছিলাম বাংলা একাডেমির বিক্রয় কেন্দ্রে।


লিখতে লিখতেই খেয়াল করলাম সচলের ব্যানার পরিবর্তন হয়ে গেছে। বইমেলা নিয়ে নতুন ব্যানার এসেছে। ব্যানারের কোণায় বই হাতে বাড়ি যাওয়া মানুষটা কে দেখেই কেন জানি আমার পান্ডব’দার কথা মনে হল। এইবার মেলায় এই একজন লোক যার সাথে যেদিনই দেখা হয়েছে দেখি এক গাদা বই নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে। আজকেও দেখলাম বই কিনেছেন বেশ কিছু। বইমেলায় মেলা শেষে সবচেয়ে বেশি বই যিনি কিনেন তাকে পলান সরকার পুরষ্কার দেওয়া হয়। পান্ডব’দা যদি এইবার বাকি বইমেলা এই ফর্মে বই কিনে যেতে পারেন আশা করি পলান সরকার পুরষ্কারটা সচলেই থেকে যাবে। গতবার পুরষ্কারটা পেয়েছিল নজরুল ভাই।

এই পলান সরকার পুরষ্কার দরিদ্র্য মেহনতি বইপ্রেমীদের হাতে আনার জন্য ঐদিন মেলায় একটা প্ল্যান হয়েছিল। কথা হয়েছে একটা সিন্ডিকেট গঠন করা হবে, সেই সিন্ডিকেটের সদস্য হবে সেইসব মেহনতী জনগণ যারা মেলায় আসে প্রায় প্রতিদিন কিন্তু বই কিনে কম, দেখে বেশি আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আর বেশি। এই সিন্ডিকেটের সদস্যগণ নিজেদের কেনা প্রত্যেকটা বইয়ের মেমো মেলার শেষে একসাথে জমা দিবেন সিন্ডিকেটে এবং সবশেষে সিন্ডিকেট নিখিল বিশ্ব দরিদ্র্য বইপ্রেমীদের নামে সব মেমো জমা দিবে মেলা কর্তৃপক্ষের কাছে। এরপর আর পুরষ্কার ঠেকায় কে। যৌথভবে এই গৌরবের অংশীদার হতে চাইলে আজকেই যোগাযোগ করুন 😀


আজকে মেলায় একটা জিনিস খেয়াল করলাম যেটা গত কয়েক বছর ধরেই ছিল তবে এইবার নেই, সেটা হল সেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি। অনান্য বছর মেলায় ঢুকলেই দেখা যেত কেউ না কেউ এসে রক্ত ডোনেট করতে বলছে। ক্যাম্পাসের শুরুর দিকে একবার মেলায় বন্ধু-বান্ধবসহ ঢুকে দেখি আমাদের গ্রুপটাকে এইরকম রক্ত সংগ্রাহক একদল সেচ্ছাসেবী ঘিরে ধরেছে। সেচ্ছাসেবীরা তাদের খায়েশ বলার সাথে সাথেই দেখি বন্ধুবান্ধবদের একজন কানে ফোন লাগিয়ে অতি জরুরী আলাপ শুরু করেছে আবার অন্যদুইজন কিছু না শোনার ভান করে অন্যদিকে হাটা দিয়েছে। সব দেখে যখন সাহস করে বললাম, চলেন আমিই রক্ত দিব তখন আমার দিকে ভালভাবে তাকিয়ে ভলান্টীয়ারদের একজন বলল ভাই আপনাকে দিয়ে হবে না আপনি আন্ডার ওয়েট। বুঝলাম দুনিয়াতে সাহসের কোন কদর নাই 😦

তবে যার জন্য এত কথা সেটা হল, মেলাতে টিস্যুর দোকান, রেডিওর স্টল না দিয়ে রক্তদান কর্মসূচির জন্য দুয়েকটা স্টল দিলে বরং ভাল হত।


আজকে মেলার শেষের দিকে শিববাড়িতে দারুণ একটা আড্ডা জমল। এই আড্ডাতে ছিল মনামী আপু, তারেক ভাই, সবজান্তা ভাই, এনকিদু ভাই এবং পলাশ মিয়া। সেখানে গরম চা’য়ের সাথে মিশর সমস্যা, মধ্যপ্রাচ্যে রাজনীতি, মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ইত্যাদি ইত্যাদি নানা গুরুগম্ভীর বিষয়ে আলোচনা হল। সেখান থেকে আড্ডা বই, সিনেমা জাতীয় উত্তরাধুনিক বিষয়েও চলে আসল একটু পরে। উত্তরাধুনিকতা কী জিনিস প্রশ্ন করায় মনামী আপু একটা বইয়ের নাম দিল। তবে সে বই পড়ে লাভ হবে কীনা জানি না কারণ আমাকে উত্তরাধুনিকতা বোঝাতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে এক বন্ধু সহজ এক সূত্র দিয়েছিল। ব্যাটা বলছিল- যা বুঝিস না সেটাই উত্তরাধুনিক। সেই থেকে আমি এই সহজ সূত্রই মেনে চলি।


এইবারের মেলায় আসলেই একটা বিরক্তিকর বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে মেলার থিম সং। একটু পর পরই শুরু হয় ছায়াছন্দের সুরে- গ্রনথো মেলা, গ্রনথো মেলা। যেখানেই যান এই “গ্রন্থমেলা” গানটা আপনার পাশেই থাকবে। তবে সেই তুলনায় এইবারের ঘোষণা মঞ্চের মাইক অনেক নীরব আছে।


আজকের মত গল্প এইখানে ফুরালো, নটে গাছটি মুড়ালো।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s