বইমেলার গল্প- ঙ


গত দুইদিন মেলায় যাই না আজকে তাই সন্ধ্যায় যাবতীয় কাজ এবং আকাজ বাদ দিয়ে রওনা দিলাম বইমেলার দিকে। মেলার ঢুকার মুখেই দেখি আবার লাইন আবার ভীড় অবশ্য এই ভীড়ের পিছনে যতটা না মানুষের সংখ্যা দায়ী তার থেকে বেশি দায়ী মেলা কর্তৃপক্ষ। সন্ধ্যার সময়টা হচ্ছে মেলার পুরা পিক আওয়ার, এই সময়ে শুধু এক লাইনে লোক ঢুকানো হলে ভীড় তৈরি হবেই। শুক্র, শনি ছুটির দিনগুলিতেও যদি এই নিয়মে লোক ঢুকানো হয় তবে মানুষের মূল্যবান সময় খালি নষ্ট হবে। এইসব হাবিজাবি নানা কেরামতি দেখতে দেখতে মেলায় ঢুকেই শুনি নজরুল ভাই, সুহাস ভাই আর আশরাফ ভাইদের এক বিশালদল একটু আগেই নাকি মেলা ছেড়ে গেছে। একটু পরে হয়রান আবীর আর স্পর্শ ভাইয়ের সাথে দেখা হল, উনারাও দেখি আজকে সকাল সকাল মেলা ছেড়ে চলে যায়। শুনলাম একটু আগে নাকি সচল আশরাফ মাহমুদ এসেছিল এবং চলেও গেছে। সবাই চলে গেছে শুনে আবার ভাববেন না আজকে একাই কাটিয়েছি সময় কারণ দিনের শুরুটা অনেক সময় শেষের গল্পটা বলতে পারে না।


একাএকা ঘোরাঘুরি করতে করতে হঠাৎ করেই ভার্সিটির তিন বন্ধুর সাথে দেখা। বই কিনতে আসছে। ঘোরাঘুরির মাঝেই বলল এন্থনি মাসকারেনহাসের “লিগাসি অব ব্লাড” বইটা কিনবে, জিজ্ঞেস করল কই পাওয়া যাবে জানি নাকি। ঠিক কোন প্রকাশনী থেকে বইটা বেরিয়েছে মনে নেই তবে এইসব ক্ষেত্রে যা করার তাই করলাম মেজর কামরুল ইসলাম ভূইঞা (বীর প্রতীক) এর মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত স্টলে নিয়ে গেলাম। এইখানে সুবিধা হল নানা প্রকাশনীর মুক্তিযুদ্ধের উপর বইগুলো একসাথে পাওয়া যায়। যাই হোক বন্ধুদের মধ্যে যে বইটা কিনবে সে তেমন একটা বই পড়ে না তাই এই বইয়ের খোঁজ কই পেল প্রশ্ন করলাম। পাশের জন বলল সেই বলেছে। ৭১-৭৫ এর নানা ঘটনাবলী বিশেষ করে ৭৫ নিয়ে আমাদের অনেকের নানা কৌ্তুহল আছে, যে বই কিনতে চাচ্ছে তারো আছে তাই প্রাথমিক ভাবে এই বই দি্যে শুরু করতে চাচ্ছে। মজা লাগল এই ভেবে যে প্রথমজনকে যে বন্ধু বইটার খোঁজ দিয়েছে তাকেই আমি একসময় বইটার খোঁজ দিয়েছিলাম আবার আমাকে বইটার খোজ দিয়েছিল আরেক বন্ধু। সন্দেহ নাই তিন গোয়েন্দার সেই ভূত থেকে ভূতে পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত বইয়ের পাঠকদের মাঝেই।


বন্ধুদের বিদায় দিয়ে একা একাই কিছুক্ষণ বইপত্র দেখলাম। পাঞ্জেরীর স্টলের সামনে গিয়ে দেখি এদের বই সেই গাইড বই স্টাইলেই বের করেছে। যারা জীবনে কোন একসময় পাঞ্জেরীর কোন গাইড বই পড়েছেন তারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন তাদের উজ্জ্বল ঝকঝকে প্লাস্টিক কভারের গাইড বের করার প্রবণতা ছিল, মেলায় বইয়ের ক্ষেত্রেও এরা দেখি সেই প্রবণতা ছাড়তে পারে নি। এরকম নানা স্টল দেখতে দেখতে মানুষজন খুজতে তারেক ভাইকে ফোন দিলাম। শিববাড়িতে আসতে বলল ঐখানে নাকি চা খায়।শিববাড়িতে যাওয়ার সময় শুনলাম আজকের বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানে এক মহিলা রবীন্দ্র সংগীত গাইছেন। আজকে মেলার ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়ার সাথে গানটা ভাল লাগছিল তাই একবার দাঁড়িয়ে চেনার চেষ্টা করলাম শিল্পী কে। ভাল করে দেখে বুঝলাম চিনি না তাই আবার গান শুনতে শুনতে শিববাড়ির দিকে রওনা দিলাম, গিয়ে দেখি ভিতরে পলাশ মিয়াও আছে আবার ঐখান থেকে বের হতে গিয়ে দেখা হয়ে গেল রিটন ভাই আর সবুজ বাঘের সাথে। রিটন ভাই চা খাওয়ার কথা বলল বাকিরা একদফা খাওয়া হয়েছে বলে খাবে না বলল আর কেউ খাচ্ছে না বলে আমিও চুপ করে গেলাম। এর মধ্যে বাঘাদা, তারেক ভাই, পলাশ আর আমি গল্প শুরু করলাম।এর মধ্যে বাঘাদা দাবি করলেন সায়েস্তা খা’র নাম থেকেই “সস্তা” শব্দের উৎপত্তি, আমাদের কার কাছে এর থেকে ভাল থিওরি নাই দেখে আমরাও মেনে নিলাম। হঠাৎ খেয়াল করে দেখি শিববাড়ির পাশেই ইগলু একটা আইসক্রিমের দোকান দিয়েছে। হালকা ঠান্ডার মধ্যেও দেখলাম লোকজন বেশ কিনছে। দোকানটার পাশেই দেখি প্লাস্টিকের ছেড়া ব্যানার গুলি দিয়ে বিশাল কিছু একটা ঢাকা, সবার সাথে গল্প করতে করতে ভাবছিলাম কি হতে পারে ঐখানে। হঠাৎ করেই মনে পরল ঐ জায়গায় একটা ডাস্টবিন ছিল। ইগলুর এই চমৎকার বুদ্ধি দেখে অভিভূত হলাম। বুঝলাম জীবনে ব্যবসার লাইনে গিয়ে খুব একটা কামিয়াব হতে পারব না কারণ একটা ডাস্টবিনের পাশেই এরকম একটা চমৎকার ব্যবসার বুদ্ধি আমার মাথা থেকে কখনো আসতই না।


লোকজন বেশি থাকলে গল্প হয় বেশি কিন্তু বই দেখা হয় কম তাই আজকে মানুষজন কম থাকায় সেই সুযোগটাই নিলাম। আমি আর তারেক ভাই অনেকক্ষণ ধরে নানা স্টল ঘুরে ঘুরে বই দেখলাম। আমাদের দুইজনের অবস্থাই একি। বই কিনি কম, দেখি বেশি আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি আর বেশি। এই বই দেখাদেখির ফাকে একটা মজার ঘটনা ঘটল, দিব্য প্রকাশের স্টলে দাঁড়িয়ে আছি এসময়া দুইজন প্রায় মধ্যবয়স্ক মহিলা এসে হাজির। নানা বইটই নেড়েচেড়ে দেখছে। এদের মধ্যে একজন একটু বেশি কথা বলে বুঝা যায় উনি বললেন কথাটা- কী রুদ্র না মোহাম্মদ একজন আছে, ভাল কবিতা লেখে। আছে আপনাদের কাছে তার বই? স্টলের লোকজন এই লেখক কে চিনতে পারল না। উনি আবার বলল- আরে খুব বিখ্যাত কবি। স্টলের একজন এইবার বলে- আপনি কী রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লার কথা বলেন? মহিলা আবার বলল- আরে না কবির নাম রুদ্র মোহাম্মদ। এইবার দুইজনের মধ্যে চুপচাপ জন বলল- আপা নামের শেষে মনে হয় শহীদুল্লাহ আছে। ঐ মহিলার তাতেও কোন বিরাম নাই উনি বারবার রুদ্র মোহাম্মদের বই খুজে যাচ্ছেন। ঐ মহিলা আর স্টলের লোকজনের কথা শুনে বুঝলাম কবিদের মরেও সুখ নেই কারণ দুনিয়াজুড়ে প্রচুর গিয়ানজাম।


আজকে তিনটা বই কিনলাম, অনেকক্ষণ স্টল ঘুরে ঘুরে সময় নিয়ে। এর মধ্যে প্রথমটা হচ্ছে “প্রশাসনের অন্দরমহল বাংলাদেশ”। মুনতাসীর মামুন এবং জয়ন্তকুমার রায়ের যৌথ রচনা, দিব্য প্রকাশ থেকে। বইটা আগেই পড়াছিল, দারুণ বই। পাকিস্তান আমল থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত বাংলাদেশের সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের টুকরো টুকরো বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে রচিত বইটা। বিভিন্ন তত্ত্বে্র কচকাচানি বাদ দিয়ে যদি বাংলাদেশে প্রশাসন ব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে কীভাবে কাজ করে বুঝতে চান তাইলে এরমত দারুণ বই কম আছে। আগে পড়া হলেও সংগ্রহে রাখার জন্য কিনে ফেললাম। দ্বিতীয় বইটা আহমদ শরীফের “মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস”। আগামী প্রকাশনীর স্টলে দাঁড়িয়ে বই নেড়েচেড়ে দেখার সময় পছন্দ হয়ে গেল। তিন নাম্বার বইটা মুক্তধারা থেকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর “নিরাশ্রয় গৃহী এবং অনান্য প্রবন্ধ”। বইয়ের দাম জিজ্ঞেস করতে বলল ২৪টাকা। আহ শান্তি, ঐ সময় এমনিতেই টাকা শেষ হয়ে আসছিল তাই বইয়ের দাম শুনে আর বেশি শান্তি লাগল। দরিদ্র বইপ্রেমীদের জন্য বেঁচে থাক মুক্তধারা, বেঁচে থাক বাংলা একাডেমি।


বইমেলার সময় একটা পত্রিকা বের হয় বইমেলা উপলক্ষ্যে, বইমেলা প্রতিদিন। প্রতিদিন বের হয় জানি কিন্তু কোথায় পাওয়া যায়, কই টাকা দাম ইত্যাদি কিছুই জানি না। মেলায় মানুষজনের হাতে প্রায়ই দেখি বিশেষ করে লিটল ম্যাগ চত্বরে মানুষজন দেখি বসার জন্য এটার উত্তম ব্যবহার করে। আজকে লিটল ম্যাগ চত্বরে বসে থাকার সময় পাশেই একটা পত্রিকা পরে থাকতে দেখলাম। তুলে নিয়ে চোখ বুলাতে বুলাতে দেখি আজকের হেডিং করেছে প্রধানমন্ত্রীর গাজীপুরে স্কাউট সম্মেলন কে। বইমেলার সাথে এই সম্মেলনের কি মিল আছে খোজার জন্য পুরা সংবাদ পড়েও কিছু বুঝতে পারলাম না। তবে ভাল জিনিস আছে প্রথম পৃষ্ঠার বাম পাশে প্রতিদিন একজন ভাষা সৈনিক কে নিয়ে প্রতিবেদন। এরমধ্যে একজন ফাইজলামি করে বলল, জামাত কোনকালে ক্ষমতায় আসলে এই পত্রিকায় ফেব্রুয়ারির ২৮ দিনই গোলাম আযম কে নিয়ে প্রতিবেদন করবে। জামাত তাদের প্রপাগান্ডা মেশিনে যেভাবে এটাকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলছে এখনই এই নিয়ে লেখালেখি না হলে হয়ত ভবিষ্যতে হয়ত একমাত্র ভাষাসৈনিক গোলাম আযম নামে মেলায় বইও চলে আসবে। গোলাম আযম নিয়ে ফাইজলামি করতে করতে বললাম, গো আযম যে যুক্তিতে নিজেকে ভাষা সৈনিক দাবি করে সে একই দাবিতে ২১ আগাস্টের ঢাবির আন্দোলনের আমিও একজন নেতা দাবি করতে পারি তবে আফসোস আমার পিছনে ভাল কোন প্রপাগান্ডা মেশিন নাই।


আজকে মেলার শেষের দিকে শুদ্ধস্বরের সামনে আড্ডা জমল। লীলেন ভাই এরা আগে আরেকদিন বলছিল, উনি প্রতিবার মেলায় রাস্তা থেকে টাকা খুজে পায় এইবার এখনো নাকি পান নাই। এটা নিয়ে আফসোসও করলেন সেদিন। তবে আজকে আড্ডা দিতে দিতেই হঠাৎ একটা দুই টাকা পেয়ে গেলেন। বাঘাদা অবশ্য বললেন টাকাটা নাকি ভাবীই প্রথম দেখছিল কিন্তু লীলেন ভাই দাবি ছাড়লেন না, আমরা অবশ্য এটা লীলেন ভাই আর ভাবীর আন্তঃমন্ত্রনালয় বিবাদ বলে কাউকেই সাপোর্ট দিলাম না। টুটুল ভাই এই টাকা পাওয়ার খুশিতে সিন্নি খাইতে চাইলেন আর আমরা বাকিরা খাইতে চাইলাম চিংডির মাথা। লীলেন ভাই অবশ্য আমাদের নানা ভুজুং ভাজং দিয়ে কথা অন্যদিকে নিয়ে গেলেন। উনি দাবি করলেন এইভাবে টাকা পাওয়া শুভ লক্ষণ, কালকে থেকেই নাকি মেলা এবার দারুণ জমবে। তারেক ভাই এটা শুনে বলে লীলেন্দা চালাক জ্যোতিষি কারণ কালকে শুক্রুবার, মেলাতে এমনিই লোক হবে। এইসব চালাক জ্যোতিষি, চিংডি মাছ, আন্তঃমন্ত্রনালয় বৈঠক ইত্যাদি ইত্যাদি কথা বলতে বলতেই শোনা গেল সেই বিখ্যাত গ্রন্থমেলা গানটা। এটা মনে হয় এখন মেলার সমাপনী সংগীত। মেলা শেষে মেলা থেকে লোক বের করার একটা ভাল পদ্ধতি এটা, বারবার এই গান বাজতে থাকে আর লোকজন গ্রন্থমেলা গানের অত্যাচারেই চুপচাপ বের হয়ে যায়। আমরা অবশ্য এই অত্যাচার সহ্য করেও মেলা শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ মেলার ভিতরে আড্ডা দিলাম।


আজকে আর না বাকি কথা শুক্কুরবারের মেলা দেখার পর হবে

*দিন কয়েকের পুরাতন লেখা তবে আজকে দিলাম

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s