এইসব সাদাকাল দিনে-০৪

০।
আজকাল প্রায় সকাল আটটার ক্লাস করা হয় না। স্যার ক্লাসে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলে আর ঢুকার উপায় নেই তাই প্রায় দিন চার তলায় উঠে দেখি ক্লাসের দরজা বন্ধ ঘড়িতে তখন হয়ত আট’টা পাঁচ বা ছয়। এইভাবে ক্লাস মিস করতে করতে ভাবি কীভাবে যে কলেজে থাকতে সকালে পিটিতে যেতাম তা শুধু আল্লায় মালুম। সেভেন এইটে ডিউটি ক্যাডেট থাকতে হুইসেলেরো আর অনেক আগে উঠে কীভাবে অন্যদের জাগাতাম এইটা এখন আমার নিজের কাছেই এক সপ্তমাশ্চার্য। এখন তাই ক্লাস মিস করলে কলেজের কথা মনে আসে আর কলেজের কথা মনে আসলে রাজ্জাক স্টাফের ডায়লগ মনে আসে- ডিসিপ্লিনের পুরাই বেগাইরতি অবস্থা 😀

০১।
ডিউটি ক্যাডেটের কথা যেহেতু উঠল তাইলে একটা ঘটনা বলি শুনেনে। তখন আমরা ক্লাস সেভেনের থার্ড টার্মে, নভিসেস শেষে আমরাই হাউজ ডিউটি ক্যাডেট। সম্ভবত সেটা ছিল আমার হাউজ ডিউটি ক্যা্ডেট হিসেবে সেকেন্ড বার। সম্ভবত বাঁশির টাইম ছিল সোয়া পাচঁটা। যেভাবেই হোক কোন ভুল করা যাবে না এই রকম একটা কঠোর প্রতিজ্ঞা নিয়ে আগের রাতে ঠিক করে রিপোর্ট লিখলাম। সকালে উঠার জন্য রুমমেট শুভ্রর ঘড়ি নিলাম এল্যার্ম দেওয়ার জন্য এবং ঘটনার শুরু এখান থেকেই। যাই হোক এল্যার্ম ঠিকঠাক মত। বাজলোও, লাফ দিয়ে উঠে দেখি বাইরে এখনো পুরাই কুচকুচে রাত। ডিউটি ক্যা্ডেট কে হাউজে সবার আগেই উঠতে হবে এইটাই তখন ঘুরছিল মাথায় তাই আকাশ কেন এখনো একটু ফর্সা হল না এইটা নিয়ে মাথা ঘামানোর মত সময় তখন আমার অবশিষ্ট ছিল না। রুমে রুমে গিয়ে লোকজন কে জাগানো শুরু করলাম। রিবেল, ওয়ার্নিং পেয়ে আস্তে আস্তে সবাই উঠে ব্রাশট্রাশ নিয়ে রেডিও হতে শুরু করল। এরমধ্যে নামাজি পার্টি এক বড় ভাই জিজ্ঞেস করল আযান দিছে কীনা। আমি ভাবলাম বাঁশির আগেই যেহেতু আযান পরে এবং বাঁশির সময় হয়ে আসছে তখনো আযান পরে নাই এইটা হতে পারে না হয়ত আজকে আযান একটু আগেই পরছে এবং আমি অবশ্যই টের পাই নাই। তাই সেই বড় ভাই কে বললাম- জ্বী ভাই, আযান দিছে। এরমধ্যে দেখি অন্য দুই হাউজে কোন সাড়াশব্দ নাই। অবাক কান্ড! বাশির আর বেশি বাকি নাই এর মধ্যে এরা উঠে না কেন। এতশত না ভেবে আমি আবার সব রুমে রুমে ওয়ার্নিং দেওয়া শুরু করলাম। ঠিক এই সময় এক সিনিয়র ডাকছে- ঐ রাশেদ এদিক আস।
-জ্বী ভাইয়া
-কয়টা বাজে?
– ভাইয়া পাঁচটা দশ।
-বাঁশি কয়টায়?
-সোয়া পাঁচটা
এইবার সিনিয়র তার হাতঘড়ি সামনে আগায়ে দিয়ে- এইখানে কয়টা বাজে?
-সোয়া চারটা
-তাইলে একঘন্টা আগে সবাইরে জাগাচ্ছ কেন?
– ভাইয়া আমার ঘড়িতে তো পাঁচটা দশ বাজে
-যাও হাউজ মাস্টারের অফিসের সামনের ঘড়ি দেখে আস কয়টা বাজে
ঘড়ি দেখেটেখে এসে বলি- ভাইয়া সোয়া চারটা বাজে
তখন সিনিয়রের উত্তর- দুপুরে লাঞ্চের পর দেখা করবা।
এরপরের ঘটনা আর ভয়ংকর। প্রত্যেক রুমে রুমে গিয়ে চেক মেরে বলি ভাইয়া বাশির আর এক ঘন্টা বাকি আছে তখন প্রথমে সবাই ঘটনা কী জানতে চায় এরপর সমস্ত ঘটনা কী জেনে হয় লাঞ্চের পর বা প্রেপের পর দেখা করতে বলে। ঐদিন আর কী কী ভয়ংকর কান্ড ঘটাইছিলাম তা আজকে আর না বলাই ভাল শুধু দিনের শুরুর নমুনা দিয়েই বুঝে নেন 😦

০২।
সকালবেলা পত্রিকা খুললে ভাল খবর চোখে পরে কদাচিত। আজকে মনে হয় সেরকম একটা দিন। প্রথমেই যে খবরটা চোখে পরল সেটা হল- বাবা নেই তবে পরিবার পেলেন নেথা। আগের দিন পত্রিকায় নেথার কথা এসেছিল আর আজকে আসল সুখবরটুকু। অনেক বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বাবার খোজে ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে এসে হাজির হয় নেথা, সম্বল শুধু বাবার ছবি, তার নাম আর বাড়ি সিলেট এইটুকু তথ্য। একমাস খোজাখুজি করলেন এরপর সাহায্য নিলেন পত্রিকার। গতকালের প্রথম আলোতে রিপোর্ট আসল এটা নিয়ে। এতদিনে বাবা বেচে নেই, বাবার পরিবারের প্রায় সবাই থাকেন বাইরে। এরমধ্যে কাকতালীয় ভাবে দেশে এসেছিলেন বাবার চাচাত ভাই। ঘটনাক্রমে তিনি জানতে পারেন পত্রিকার এই রিপোর্টের কথা। আর এইভাবেই সমাপ্তি ঘটে নেথার এত বছরের অনুসন্ধানের। সকাল বেলা এইসব ভাল ভাল খবর পড়লে মনটা কেমন জানি ফুরফুরে লাগে।

০৩।
সিনেমার ক্ষেত্রে আমি যা পাই তাই দেখি টাইপ দর্শক। এক বন্ধুর কাছে যখন শুনলাম নতুন প্রায় খান ত্রিশেক সিনেমা আছে তখন ভাল খারাপ তেমন একটা বাছবিচার না করেই নিয়া নিলাম। তা এই খান ত্রিশেক সিনেমা থেকে এই সাপ্তাহে দেখা হল গোটা দুইখান এবং দুইটাই ভাল লাগল। আমার আবার কোন কিছু ভাল লাগলে সেটার স্বাদ অন্যদেরো দিতে ইচ্ছে করে তাই ভাবলাম দুই সিনেমা নিয়েই অল্প অল্প করে কিছু কথা বলি।

প্রথমে দেখছি “ইনসাইডাইর(insider)”। রাসেল ক্রো আর আল পাচিনোর সিনেমা। আল পাচিনো সিবিএস চ্যানেলের বিখ্যাত টকশো সিক্সটি মিনিটসের প্রডিউসার আর রাসেল ক্রো এক সিগারেট কোম্পানীর চাকরিচ্যুত সাইন্টিস্ট। কাহিনি সংক্ষেপে বলতে গেলে সিগারেট কোম্পানীগুলোর মিথ্যাচার আর সেই মিথ্যাচার কে সামনে আনতে দুইটা মানুষের যুদ্ধের গল্প এই সিনেমা। এই করপোরেট যুগে কীভাবে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সামান্য ক্ষতির আশাংকা দেখলে তাদের প্রচন্ড শক্তি দিয়ে আঘাত করতে পারে তার গল্প এই সিনেমা কিংবা প্রচন্ড চাপের সময় কিছু মানুষের দূরে চলে যাওয়া বা কাছে আসার গল্প এই সিনেমা। সিনেমাটা দেখতে গিয়ে বারবার যে কথাটা মাথায় এসেছে সেটা হল এই সিনেমা বানাতে অভিনেতাদের পারিশ্রমিক বাদে খুব বেশি খরচ নেই তাহলে কেন আমাদের দেশে বানানো যাবে এই মানের সিনেমা। ভাল সিনামার কথা উঠলেই দেখি বোদ্ধারা প্রযুক্তি আর অর্থ এই দুয়ের কথা বলে গলা ফাটিয়ে ফেলেন কিন্তু এইসব সিনেমা দেখার পর আমার মনে হয় আসলে আমরা প্রযুক্তি কিংবা অর্থে যতটা না পিছিয়ে আছি তার থেকে বেশি পিছিয়ে আছি আমাদের সিনেমা কালচারে।

দ্বিতীয় যে সিনামটা ভাল লাগছে সেটা একটা এনিমেশন ফিল্ম। সাধারণত এনিমেশন খুব একটা ভাল লাগে না তবে এইটা লাগছে। সিনেমাটার নাম “how to train your dragon”। কাহিনি সংক্ষেপে বললে, এক যে ছিল ভাইকিংদের ছোট্ট এক গ্রাম। সেই গ্রামে প্রায়ই এসে হানা দেয় ড্রাগনের দল। সেই গ্রামেই থাকে নায়ক হিকাপ। তারো খুব ইচ্ছে সে ড্রাগনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয় কিন্তু কেউ তারে পাত্তা দেয় না। এরপর সেই চিরন্তন গল্প, কীভাবে হিকাপ আস্তে আস্তে ড্রাগন বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠে। কীভাবে তার বন্ধুত্ব হয় সবচেয়ে ভয়ংকর ড্রাগন নাইট ফিউরির সাথে। তবে সোজাসাপ্টা কাহিনি হলেও দারুণ মজা লাগছে সিনেমাটা। কেন জানি এইসব সাধারণ মানুষের জয়ী হওয়ার গল্প আমার সবসময়ই ভাল লাগে। তাই মন খারাপ থাকলে দেখে ফেলতে পারেন সিনেমাটা মন ভাল হবে নিশ্চিত।

০০।
সিসিবিতে অনেকদিন কিছু লেখা হয় না। অনেকদিন লিখব লিখব করে এডিটর খুলেও অনেক সময় শ’খানেক শব্দ লিখেও আবার হয়ত পুরাটাই শিফট ডিলিট মারছি। দিনিলিপি টাইপ লেখা ছাড়া আসলে তেমন কিছু লিখতে পারি না আবার মাঝখানে মনের মধ্যে সন্দেহ ঢুকল যা লিখি সেইসব দিনিলিপি কী ব্লগের প্রথম পাতায় ঝুলিয়ে দেওয়া যায় কীনা তাই নিজস্ব ব্লগে লিখলেও সেগুলো এখানে দেওয়ার সাহস করি নি। তবে আজকে সকালে মন ফুরফুরে তাই ভাবলাম গুল্লি মারি সন্দেহ নামক খারাপ রোগটাকে। যা লিখছি তাই দিয়া দেই আর বেশি খারাপ হলে শিফট ডীলিটের অপশনতো থাকলোই 🙂

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s