মন পবনের নাও ১৪

০।
এখনো বারটা বাজে নি কিন্তু বাইরে টুকটাক বাজি ফুটছে। ফেসবুকে হোম পেজের অধিকাংশ জুড়ে আছে বন্ধুদের নতুন বছর নিয়ে দেওয়া স্ট্যাটাস। এর মাঝে কেউ গত বছরের দেনা পাওনার হিসেব করছে, কেউ বা শুধু মাত্র শুভেচ্ছা জানিয়েই খালাস। একটু দূরে বিছানার উপর রাখা মোবাইল এর মাঝেই দুই তিনবার শব্দ করে নতুন মেসেজের অস্তিত্ব জানিয়েছে। ইনবক্স না খুলেই বলতে পারি শুভেচ্ছা জানিয়েছে কেউ না কেউ। আমি অবশ্য এত কষ্ট করে কাউকেই শুভেচ্ছা জানাই নি কারণ মায়ান ক্যালেন্ডার সত্য হইলে এইসব কিছুই মিছে 😀

মায়ান ক্যালেন্ডারের কথা আসায় আরেকটা পুরাতন কথা মনে আসল। ইন দ্যা ইয়ার টু থাউজেন্ড, যখন আমরা বাচ্চা থেকে বড় হইবার পথে কিছুটা অগ্রগামী তখনকার একটা কথা মনে পড়ল। সেই সময় থাকি হোস্টেলে। পেপার পত্রিকার বালাই নাই। বড় ভাইদের জ্বালায় আজকের পেপার পড়ি তিনচার দিন পর, সোজা হিসেব আমরা তখন তাবৎ দুনিয়া থেকে তিন চার দিন পশ্চাৎগামী। ঠিক সেই সময় কোথাকার কোন সাধু নাকি বাণী দিয়েছিল দুনিয়ার আর বেশি দিন নাই, দুই হাজার বছরের বেশি বাচার খায়েস নাকি দুনিয়ার নাই। এর মধ্যে আবার কী সব Y2k ব্যাপার স্যাপার। আমাদের হোস্টেল জীবনে তেমন কোন উত্তেজনা নাই, সকাল পাচটায় ঘুম থেকে উঠি আবার রাত এগারটায় ঘুমাতে চলে যাই। এর মধ্যে দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে এই রকম খবর শুভ্রের কাজকর্ম বা জাহিদের ঘুম কিংবা নতুন ভূগোল ম্যাডামের থেকেও আলোচনার জন্য উত্তেজক মনে হয়। আমাদের মধ্যে এক দলের আবার কন্সপিওরেসি থিউরীতে অবিচল আস্থা এবং তাদের সেই আস্থা হয়ত আমাদের মাঝেও সংক্রমিত হয়। ঠিক ঠিক মনে আছে আমরা তখন থাকতাম ৩০ নাম্বার রুমে। আমার রুমমেট সারোয়ারের সব কিছুতেই একটু বেশি উত্তেজনা। উত্তেজনায় আগুন দেওয়ার জন্য আমরা বাকী রূমমেটরা সত্য মিথ্যা মিলিয়ে গল্প বানাই। সেই গল্পে সারোয়ার আরেকটু উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করে, দোস্ত দুনিয়া যদি সত্যি সত্যি ধ্বংস হয়ে যায়? ক্লাসের সেরা অভিনেতা হাসান তখন নির্বিকার মুখে আগুনে আরেকটু ঘি ঢালে- কী আর করার আছে, আজ হোক কাল হোক কেয়ামত তো একদিন হবেই। জাহিদ তার বেডে শুয়ে এর মাঝে বিশ্রি ভাবে খ্যাক খ্যাক করে হাসে আর আমি হাসানের সাথে মিলে এক চিমটি সত্যের সাথে তিন চামচ মিথ্যে মিশিয়ে গল্প বানাই। রাত পৌ্নে এগারটায় লাইট বন্ধ হয়ে যাবার পরেও সেই রাতে আমরা বারটা পর্যন্ত জেগে থাকি। সারোয়ার জেগে থাকে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে নাকি এই কৌ্তুহলে আর ঘুম কাতুরে জাহিদ, হাসান কিংবা আমি জেগে থাকি নতুন বছরের অপেক্ষায়। ঠিক বারটায় অন্ধকারের মাঝেই অন্যান্য রূম থেকে ভেসে আসা হইচই জানিয়ে দেয় অপেক্ষায় ছিল আর অনেকে। সেই রাতের পর অবশ্য সারোয়ার কে অনেকদিন পর্যন্ত শুনতে হয়েছিল, দোস্ত দুনিয়া যদি ধ্বংস হয়ে যায় 😀

ঠিক এই মূহূর্তে বাইরে কোথাও গান বাজছে, আজ কেন মন উদাসী হয়ে গেল, দূর অজানায় চায় হারাতে। হয়ত গানটা কিংবা এগার বছরের পুরাতন স্মৃতি সব কিছু কে উদাস করে দেয়। লিখতে লিখতে চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠে, ত্রিশ নাম্বার রুম। সারোয়ারের উত্তেজিত পায়চারি, হাসানের নির্বিকার মুখে আলোচনায় আগুন দেওয়া, জাহিদের বিছানায় শুয়ে শুয়ে খ্যাক খ্যাক করে হাসি কিংবা টেবিলে বসে থাকা আমি। কয়েক হাত দূরত্বে বসে থাকা সেই দিনের আমরা আজ কয়েকশত মাইল দূরে, মাঝখানে শুধু এগারটা বছর। সারোয়ারের সাথে দেখা হয় না প্রায় বছর ছয়েক, জাহিদ আর হাসানের সাথে দেখা হয় হয়ত বছরে দুই একবার। একেকটা নতুন বছর মানে হয়ত তাই বন্ধুদের কাছ থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যাওয়া।

০১।
আজকে রাত মনে হয় নস্টালজিয়ার। একটু আগে আশালতার একটা লেখা পড়ছিলাম নতুন বছর নিয়ে। পড়তে পড়তে মনে পরে গেল নতুন বছর মানে একটা সময় ছিল নতুন বই, নতুন ক্লাস। পুরাতন ক্যালেন্ডারের পাতা দিয়ে বই বাধাই করার সময় সুন্দর সুন্দর পাতাগুলো কার ভাগ্যে পড়বে এই নিয়ে ছোট বোনের সাথে মারামারি কিংবা মাতাজানের কাছে দেনদরবার। আমার হাতের লেখা আবার সুন্দর না তাই আমার মলাটের উপর বড় বড় করে মাতাজানের হাতের লেখায় ফুটে থাকত আমার নামধাম, ক্লাস, সেকশন আর রোল নাম্বার। নতুন বছর মানে পড়াশুনার চাপ নেই। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জন্য স্কুলে অর্ধেক ক্লাসের পরেই ছুটি। পাড়ি না কিছুই কিন্তু তাও দৌড় থেকে মোরগ লড়াই সবকিছুতেই অংশ নেওয়া চাই। এর মাঝে বন্ধুদের পুরষ্কারের সংখ্যা বেড়ে চলে আর আমরা অংশ গ্রহণ বড় কথা এই নিয়মে শুধু অংশ নিয়ে যাই। ক্লাস ফাইভের বছর তো এইবার পুরষ্কার নিতেই হবে এই কথা ভেবে আমরা তিন বন্ধু মিলে যেমন খুশি তেমন সাজ প্রতিযোগীতায় অপারেজেয় বাংলা সাজি। প্রতিযোগীতার আধা ঘন্টা আগে এক বন্ধুর মামা আমাদের সাজবাহার দেখে বলে উঠে- আরে আরে, এই সাজে তো তোমরা পুরষ্কার পাবা না। মরিয়া আমরা সেই মামার কথা শুনে স্কুলের পিছনের শীতকালে সেচে ফেলা পুকুরে হাজির হই। সাথে থাকা জনাকয়েক বন্ধু আমাদের তিন জনের গায়ে খুশি মনে দিয়ে যায় কাদার প্রলেপ। হাফ প্যান্ট আর খালি গায়ে শীতে ঠক ঠক করে আমরা তিনজন শুধু কাঁপি আর ভাবি এইবার নিশ্চয় কিছু একটা হবে। ভ্যানের উপর কাদা গায়ে যখন স্কুলের মাঠে আমরা ঢুকি তখন বিজন স্যার যখন বলেন- আরে এইগুলা কারা? এই দারুণ বুদ্ধিটা কার? তখন বুকে বিশ্ব জয়ের আনন্দ থাকলেও আমরা কেউ কথা বলি না কারণ মামা আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে- সাবধান কেউ কথা বলবা না। নড়াচড়া নাই, স্ট্রেট মূর্তির মতন।

সেই বছর আমরা পুরষ্কার পেয়েছিলাম।

এরপর থেকে যতদিন গেছে পুরাতন এই স্মৃতি ফিরে এসেছে অনেকবার। ব্যর্থতা হতাশ করেছে অনেকবার, অনেক ক্ষেত্রে। কিন্তু তাও অংশ নিয়ে গেছে বারবার সাফল্যের আশায় কারণ আমি নিশ্চিত জানি কোন না কোন একদিন অনেক বছর আগের সেই বিজন স্যারের মত কেউ না কেউ বলে উঠবে- আরে এই চমৎকার বুদ্ধিটা কার।

০২।
জাফর ইকবালের আধ ডজন নতুন স্কুল বইটা পড়েছেন কেউ? ঐ বইয়ের মত আমার জন্যও ছিল ফি বছর নতুন স্কুল, অনেক সময় এক বছরেই দুইটা নতুন স্কুল। তাই স্কুলের সংখ্যা আধ ডজন ছাড়িয়েছে সেই কবে। যাদের বাবার বদলির চাকরি তাদের অনেককেই হয়ত কম বেশি এই অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে। নতুন বছর মানে তাই আগে আমার কাছে ছিল অনেকটা অনিশ্চয়তার মত। নতুন স্কুল না পুরাতন স্কুল, পুরাতন শহর না নতুন কোন এক শহর এই সব নিয়ে ভাবনা মানেই না নতুন বছর। আমি দুবলা পাতলা সাইজের মাঝারি মানের ছাত্র যার নতুন মানুষদের সাথে মিশতে সময় লাগে। প্রথম কোন স্কুলে গেলে বাকি সবার কাছে তাই আমি বিশেষ্যত্বহীন নতুন আরেকটা ছাত্র। নতুন স্কুল মানে তাই বন্ধুহীন প্রথম কয়েক মাস এবং পুরাতন বন্ধুদের জন্য মন খারাপ হওয়া। এর মাঝে আস্তে আস্তে বন্ধু হয়ে উঠা কার কার সাথে। সময়ের সাথে সাথে সেই বন্ধুত্ব ক্লাসে পাশাপাশি বসার থেকে টিফিন ভাগাভাগির পর্যায়ে উঠে আসা এবং তারপর আবার আরেকটা নতুন বছর। পুরাতন চক্রের নতুন শুরু। নতুন স্কুল, নতুন বন্ধু।

স্কুল জীবনের প্রথম সাত বছর তাই সেই রকম জানের কোন দোস্ত নেই আমার। তারপর? তারপর আর কী, ভাল পড়াশুনার জন্য হোস্টেল গমন। সেইখানে পরের ছয়টা বছর। ঝগড়া-মারামারি, আড্ডা আর ফেলে আসা বন্ধুত্ব। আমাদের কৈশোরে ফেলে আসা গোপন সব কথা।

০৩।
নতুন শুরু মানেই পুরাতন হিসেব নিকেশ আর নতুন চাওয়া পাওয়া। এক সময় ভাবতাম শুধু চাইলেই বুঝি সব কিছু পাওয়া যায়। তাই ক্লাস টু তে নতুন সাইকেল থেকে ক্লাস টেনে এ প্লাস পাওয়া কিংবা কলেজে ছুটিতে প্রাইভেট পড়ার সময় মিষ্টি করে হাসা মেয়েটা কত কিছু না চেয়েছি বিভিন্ন সময়ে। কিছু চাওয়া পূর্ণ হয়েছে কিছু অধরাই রয়ে গেছে চিরকাল। বয়সের সাথে সাথে পালটে গেছি আমরা আর আমাদের এইসব চাওয়া পাওয়া। ভার্সিটি লাইফের শুরুতে একটা মেয়ের ভালবাসার জন্য প্রায় পাগল হয়ে যাওয়া বন্ধুটি আজকাল একটা ভাল বেতনের চাকরি চায়। সেই মেয়েটার কথা, তার পাগলামির কথা জিজ্ঞেস করলে বন্ধুটা শুধু হাসে, বলে- আরে বড় হয়ে গেছি না এখন।

আসলেই আমরা বড় হতে চাই, বড় হয়ে যাই। সব ভালবাসা ভুলে আমরা একদিন শুধু বড় হয়ে যাই।

০৪।
গতকাল একটা সচলাড্ডা ছিল আনন্দী কল্যাণী আপুর বাসায়। পুরাই আন্তঃ গ্যালাকটিকো সচলাড্ডা। বাচ্চা থেকে ধাড়ি, বাংলাদেশ থেকে কানাডা বিভিন্ন জায়গার সচল এবং হাচল সেইখানে একসাথে জমায়েত হয়েছিল। পঁচিশ থেকে ত্রিশ জনের মত সচল হাজির হয়েছিল সেই আড্ডায়। প্রতিবারের মত কিছু দুষ্টলোক এইবারো অবশ্য নিজেদের নিবিড় বলে পরিচয় দিতে চেয়েছে তবে করিৎকর্মা শুভাশীষ’দা তড়িৎ গতিতে সেইসব চেষ্টা ভেস্তে দিয়েছেন। কথা ছিল দুপুরে খাওয়ার তবে আমি অবশ্য গিয়েছি প্রায় বিকেলে। সেই বিকেল বেলাই হাজী নাজমুল আলবাব সাহেব আমারে তার সাথে খাওয়া দাওয়ায় শরীক হওয়ার জন্য বহুত চেষ্টা করেছেন তবে ওজন বাড়বার ভয়ে আমি অবশ্য খালি দুইটা রসগোল্লা খেয়েই সন্তুষ্ট ছিলাম। তা সেই মিষ্টির স্বাদ থেকেই আচ করে নিয়েছি বাকি খাওয়া দাওয়ার কী অবস্থা। যারা যান নাই তারা আড্ডা, খাওয়া দাওয়া আর গান এই তিনই মিস করেছেন।

আড্ডা থেকে আসার সময় নিজে নিজেই ভাবছিলাম এই যে সচলের লোকগুলো এদের আমি বছর তিনেক আগেও সামানা সামনি কাউকে চিনতাম না। ২০০৮ এর ডিসেম্বরে পর পর তিনটা বড় বড় সচলাড্ডা হয়েছিল নজু ভাইয়ের ততকালীন উত্তরার বাসায়। সেই থেকে পরিচয় শুরু। আমি সন্ধ্যার সময় বাসায় বসে থাকতে পারি না। জরুরী কোন কাজ না থাকলে সন্ধ্যা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত সময়টা আমি আড্ডায় কাটিয়ে দেই প্রায় প্রতিটা সন্ধ্যা। হিসেব করে দেখলাম গত তিন বছর ধরে অন্তত বছরের ২৬৫ দিন আমি সন্ধ্যায় যাদের সাথে আড্ডা দেই তাদের সবার সাথেই পরিচয় সচলায়তন থেকে। অন্তত এইসব সমমনা মানুষদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য সচলায়তনের প্রতি কৃ্তজ্ঞতাটা বেড়ে যায় দিনদিন। হয়ত আগেও অনেকবার অনেক কারণে বলেছি তাও আজকে অন্তত একবার এই কারণে বলছি- ধন্যবাদ সচলায়তন।

০০।
লিখতে লিখতেই ফেসবুকে মানুষের স্ট্যাটাস চেক করি, চ্যাটে মানুষ জনের সাথে কথা বার্তা চালাই। বেশির ভাগ লোক তাদের বিগত বছরের ব্যর্থতা নিয়ে হতাশা জানায়। আমিও একটা স্ট্যাটাস দিব বলে যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ করি কিন্তু স্ট্যাটাস দেওয়া আর হয় না কারণ সেই হিসেবে যেমন- ব্যর্থতা আছে, বহু বছরের পুরাতন বন্ধুর স্বার্থপরতার গল্প আছে ঠিক তেমনি দারুণ বিপদে আচমকা অনাকাংখিত জায়গা থেকে সাহায্য নিয়ে হাজির হওয়া মানুষের গল্প রয়েছে। আমার দুই যুগের জীবনটাই এরকম অসংখ্য ছোট ছোট ঘটনার পুনরাবৃত্তি। তাই আমি ঠিক হতাশ হতে পারি না বরং দারুণ একটা খারাপ দিনে, যখন আর কিছুই করার থাকে না তখন মনে মনে যে কথাটা বারবার বলি, নতুন বছরের শুরুতে মনে মনে সেই কথাটা শুধু আরেকবার বলি- লাইফ ইজ বিউটিফুল।

Advertisements

5 thoughts on “মন পবনের নাও ১৪

  1. প্রিয় ব্লগার, বাংলা ওয়ার্ডপ্রেসের ব্লগার/লেখকদের নিয়ে তৈরি করা ফেসবুকের এই গ্রুপে আপনাকে যুক্ত হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

    https://www.facebook.com/groups/391373174244563/

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s