হঠাৎ একদিন এবং কিছু সত্য মিথ্যা গল্প

শয়তানের কারখানাঃ

অলস লোকদের বিশাল সমস্যা, তারা ঘুম আর শুয়ে বসে থাকা ছাড়া পৃথিবীর যে কোন কিছুর প্রতি খুব বেশিদিন আগ্রহ ধরে রাখতে পারে না। আমি অবশ্য নিজে কে নিজে কখনো অলস ভাবি না কিন্তু সমস্যা হল আমার চারপাশের সবাই ভাবে। কিছুদিন মানুষের এই ভুল ধারণা ভাঙ্গানোর চেষ্টা করে সে চেষ্টাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। তাই যুগের আবর্তনে সেই ভুল ধারণা একটি ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে আমার চারপাশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে লোকজন যখন অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা জাতীয় উপদেশ দেওয়া শুরু করে তখন হাই তুলতে তুলতে মনে মনেই ভাবি, আহা, যদি এরা কখনো আমাকে বছর তিন চার আগে বিপুল বিক্রমে রাতদিন ব্লগে মন্তব্য করতে দেখত তাইলে নিশ্চয় অলস মস্তিষ্ক জাতীয় এইসব প্যারাডক্সের শিকার হইত না। মানুষ যখন একজন সম্ভাবনাময় (!!!) অলস যুবার আলস্য নিয়ে উপদেশ বাণী বর্ষণ করে তখন মানব প্রজাতির যাবতীয় ভুলভাল ধারণা নিয়ে একটা ব্লগ লিখার কথা ভাবতে ভাবতে আমি সময় পার করি। এইভাবে ভাবতে ভাবতে একদিন থেকে দুই দিন হয়, দিন থেকে মাস হয় এবং ভাবতে ভাবতেই ওয়ান ফাইন নাইট আফটার এগার মাস সাতদিন কী-বোর্ডে খটখট শব্দ তুলে এডিটরে শব্দ সংখ্যা বাড়তে থাকে

না জেনে ভুল করো না

মহান স্থাপত্যবিদ সামিয়া হোসেন বলেছেন- <a href=”http://www.cadetcollegeblog.com/samjhang/36539″>পঁচিশ বছর একটি অসহ্য সময়</a>। কথাটার সাথে আমিও একমত। সেই লেখায় শান্তাপা পঁচিশ বছরের এই ফাড়া কাটানোর দুইটা ঔষুধ দিয়েছেন। এক, তাবলীগে যাওয়া আর দুই বিয়ে করা। প্রথম ব্যাপারটায় তেমন দিলচসবি নাই কিন্তু দ্বিতীয় ব্যাপারটায় বেজায় আগ্রহ। আমার ধারণা খালি আমি নই পৃথিবীর যাবতীয় শয়তানের কারখানার মালিকদের এই ব্যাপারে অতিশয় আগ্রহ। তবে বিজ্ঞান যাই বলুক পৃথিবীতে এখনো মিরাকল ঘটে। তাই কয়েকদিন আগে অনেকদিন পর ক্যাম্পাসে এক সিনিয়র কাপলের সাথে দেখা হয়ে যায়। সেই ভাইয়া আর আপু এককালে ব্যাপক প্রেম করে বেরিয়েছে কলাভবন থেকে কার্জন। আমরা গুটিকতক জুনিয়র বালক উনাদের পর্যবেক্ষণ করতাম আর একসাথে দীর্ঘশ্বাস ছাড়তাম। দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে আমাদের মধ্যে কেউ বলে উঠত, দেখিস একদিন আমরাও। কিন্তু পচিশ বছর কেটে গেল, কেউ কথা রাখে নি। এরি মাঝে সেই ভাইয়া আর আপু বিয়ে করেছে, বাংলা সিনেমার স্টাইলে পালিয়ে। আমাদের একজন ছিল আবার সেই বিয়ের স্বাক্ষী। তাই অনেকদিন পর আবার আমাদের সাথে দেখা হয়ে যাওয়ার পর আমরা পুরাতন গল্পের ঢালপালা মেলে দিই। এরমধ্যে আমরা টের পাই আগে যেখানে ছিল নিখাদ প্রেম সেখানে এখন ঢুকে পড়েছে তেল, নুন, ডাল আর আস্ত একটা সংসার। ভাইজান দাবি করেন আফাজান তারে আগের মত ভালবাসেন না আর আফাজান দাবি করেন ভাইজান তারে আগের মত ভালবাসেন না। এত কিছু জেনেশুনে বিয়ে ব্যাপারটা কে আমরা আর আগের মত ভালবাসতে পারি না। হয়ত এই জন্যেই কবি বলে গেছেন- না জেনে ভুল করো না।

বিস্মৃতির যুগ

আউট বই পড়া ঠিক না, এতে সময় এবং রেজাল্ট দুই নষ্ট হয়। আমার আপাতত এই দুই নিয়ে খুব একটা চিন্তা নাই তাই আজকাল ভালৈ পড়া হয়। শেষ পড়লাম ভারতীয় মেজর জেনারেল (অবঃ) উবানের “ফ্যান্টমস অফ চিটাগং”। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জেনারেল উবানের স্মৃতিচারণমূলক রচনা। মুক্তিযুদ্ধের সময় উনি মুজিব বাহিনী গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিলেন সরাসরি ততকালীন যুব নেতাদের সাহায্যে। এই বিষয়ে ততকালীন অস্থায়ী সরকার, যুবনেতা গণ এবং ভারত সরকারের ভিতরকার নানা রাজনীতি ও ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ঘটনা উনি তুলে ধরেছেন এই বইয়ে। আছে তার নিজের হাতে গড়ে তোলা ভারতের উপজাতীয় যোদ্ধাদের নিয়ে গড়ে তোলা স্পেশাল ফোর্সের পার্বত্য চট্টগ্রামে যুদ্ধের শেষ দিকে নানা গূরুত্বপূর্ণ অভিযানের কথা। আর আছে কী প্রেক্ষিতে আর কীভাবে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে উনি রক্ষী বাহিনীর প্রাথমিক কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিলেন তার নানা দিক। তবে এইসব নানা গূরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাদ দিয়ে আমাকে বরং বেশি ছুয়ে গেছে, উত্তেজিত করেছে পাকিস্থানী বাহিনী আর রাজাকারদের সাধারণ মানুষের উপর করা নানা অত্যাচারের বিবরণ পড়ে। যুদ্ধের সময় উনি ছিলেন “র” এর একজন পরিচালক সেই সুবাদে পাকবাহিনীর নানা অত্যাচারের কাহিনী উনাদের সংগ্রহ করতে হয়েছিল, তার সামান্য কিছু বিবরণ আছে এই বইয়ে। একেকটা ঘটনা পড়তে পড়তে হতাশা ঘিরে ধরে, বড় অসহায় লাগে। একেকটা অত্যাচারের ঘটনা মাথায় একেকবার আগুন ধরিয়ে দেয়। কিন্তু পড়া শেষে আবার মনে হয় কী লাভ রেগে গিয়ে? আজকাল কেউ আর এইসব জানতে চায় না। আউট বই তো লাস্ট বেঞ্চির খারাপ ছেলেরা পড়ে, ভাল ছেলেরা সব ভুলে যায়। দুনিয়া এখন রিকনশিলিয়শনের। হত্যা, মৃত্যু, ধর্ষণ সব এখন বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যায়

একটা সত্য, তিনটা মিথ্যা

কয়েকদিন আগে হঠাৎ রাস্তায় জুনাদার সাথে দেখা। ঈদের পরের দিন ছিল আমাদের কলেজের পোলাপাইনের গেট টুগেদার। কই গিয়ে খানাপিনা করা যায়ৎ এই নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমরা যখন সাধারণ সভায় ব্যস্ত তখন হঠাৎ দেখা গেল জুনা’দা কে। অনেকদিন পর দেখা। এই কথা সেই কথার পর উনি বললেন- অনেকদিন পর তোমারে দেখলাম। আমিও উত্তর দিলাম- জ্বী ভাই, অনেকদিন পর আপনাকে দেখলাম। এইটা বলার পর খেয়াল করলাম উনারে বাস্তবের দুনিয়াতো পরের কথা ভার্চুয়াল জগতেই অনেকদিন দেখি না। উনি অবশ্য দাবি করলেন উনি নিয়মিত সিসিবিতে লগইন করেন। আমি অবশ্য পরে বিভিন্ন পোস্ট টোস্ট খুজেটুজে এই কথার কোন সত্যতা পেলাম না। সারাজীবন সিনিয়র গোষ্ঠী খালি জুনিয়রদের ভুজুং ভাজং দেয়। এই ভুজং ভাজং প্রকাশ করবার জন্য জুনা’দার ফেসবুকে ঢুকতেই দেখি বিখ্যাত কাইয়ুম ভাই। পুরান অভ্যাসবসত কী খবর কাইয়ুম ভাই প্রশ্ন করতেই কাইয়ুম ভাই শুরু করলেন বিশাল গল্প- পরিবার বলল কেরসিন নাই, আমি বললাম গত সাপ্তায় কেরসিন আনলাম, কেরসিন গেল কই। কাইয়ুমের ভাইয়ের পরিবারের গল্প শুনতে শুনতে মনে পড়ল একদা জনাব কাইয়ুম সাহেব ঢাকা শহরের একজন এলিজেবল ব্যাচেলর ছিলেন উনি কবে না জেনে ভুল করে সেই পোস্ট মাসরুফ ভাইয়ের কাছে দিয়ে দিলেন। তবে এইসব খবর ভাল দিতে পারতেন লাবলু ভাই এবং তার এবিসি গং কিন্তু ঢাকা শহরে এখন অনেক রাত। অল কোয়াইট অন দ্যা ওয়েস্টার্ণ ফ্রন্ট। তাই এইসব গল্প আর প্রশ্ন উত্তর তোলা রইল কমেন্টের ঘরের জন্য।

আমরা

কলেজ থেকে বের হবার সময় আমরা অবশিষ্ট ছিলাম সাতচল্লিশ জন। দুই হাজার পাঁচের সেই সময়টায় কলেজ থেকে বের হবার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বুঝে উঠার আগেই আমরা সবাই ছিটকে পড়লাম বিভিন্ন দিকে। কেউ আর্মিতে গেল, কেউ বা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হল আর সামান্য একদল এসে জুটল ভার্সিটিতে। এই নানা জায়গায় গিয়ে আমরা সবাই নানা ভাবে বদলে গেলাম। বিভিন্ন সময় দেখা হলে এই বদলে যাওয়াটা টের পেতাম। সময়ের ধর্ম আসলে বদলে যাওয়া আর আমরা সাতচল্লিশ জন তার ক্রীতদাস। আমিও হয়ত বদলে গেছি অনেক। তবে কোথাও একটা অদৃশ্য সুতা রয়ে গেছে। তাই যতদূরেই যাই সময়মত ঠিকি সে টান দেয়। তাই তো এতদিন পর এখনো আড্ডায় শুভ্র বিনা কারণে নিজে নিজেই হাসে, জিহাদ অভিনয় করে আর মিয়া মোহাম্মদ সারেক লাইটস অফের শানে নজুল খোজে। এই সবের মাঝেই আর সাতটা বছর চলে গেল। এখন আবার ছিটকে যাবার সময়। আমি জানি এইবারের পরিবর্তন হবে আর বড়। কেউ উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ যায় আর কেউ চাকরীর সুবাদে দেশের অন্য প্রান্তে। একি শহরে থেকেই আমরা অনেক ব্যস্ত হয়ে যাই। বছরে দুই একবার আমাদের দেখা হয়। আমি জানি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর সাথে সাথে আমাদের মাথার চুল কমবে, ভুড়ি বাড়বে, মাথায় উঠে আসবে তেল, নুন, ডালের হিসেব। বিদেশ যাওয়া কার কার সাথে হয়ত দেখা হবে না বছরের পর বছর। হয়ত আর কখনোই পচিশ ত্রিশ জনের বিশাল আড্ডা আর হবে না। কিন্তু আমি জানি এত পরিবর্তনের পরেও আমাদের ভিতরের ক্লাস সেভেন গুলো একেক দিন হঠাৎ বের হয়ে আসবে তাই অনন্তকাল আমাদের আড্ডায় শুভ্র বিনা কারণে হাসবে, জিহাদ অভিনয় করবে আর মিয়া মোহাম্মদ সারেক লাইটস অফের শানে নজুল খুজবে। আর এইসব দেখে ইরফান হাসি হাসি মুখে বিরক্ত হওয়ার অদ্ভুত ভঙ্গী করে বলবে- সব হারামজাদা আগের মতই রয়ে গেছে 🙂

Advertisements

6 thoughts on “হঠাৎ একদিন এবং কিছু সত্য মিথ্যা গল্প

  1. আউট বই পড়ার কারণে আমি অনেক কিছু জেনেছি। আমাকে অনেক সাহায্য করেছে আউট বই। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে আউট বই কিনতাম। আহ! সেই দিনের কথা এখনো চোখে ভাসছে।

    পোস্টের শেষ অংশটা মন ছুঁয়ে গেল। সময় হয়তো অনেক কিছু বদলে দেয়। সময়ের পরিক্রমায় অনেকে বদলে যায়। কিন্তু স্মৃতিগুলো ঠিকই স্থির থাকে।

    শুভ কামনা আপনার জন্য। ভালো থাকুন।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s