রূপকথার দুপুর

দুপুর বড় একলা। চারদিকে যখন সকাল, বিকাল, সন্ধ্যা আর রাতের জয়জয়কার দুপুর তখন সৎ ভাইয়ের মত একলা দাডিয়ে। স্নিগ্দ্ধ সকাল, শেষ বিকেলের আলো, সন্ধ্যার আবছায়া আর রাতের রহস্য এইসব চমৎকার উপমা যখন বরাদ্দ বাকীদের জন্য দুপুরের ঝুলি তখন শূণ্য খাঁ খাঁ। লেখকেরা তখন ভয় দেখায় রৌদ্রদগ্দ্ধ তপ্ত, ক্লান্ত দুপুরের। তবুও কেন জানি এই দুপুর কে বেশ লাগে আমার। টুপ করে শেষ হয়ে যাওয়া শীতের দুপুর নয় বরং গ্রীষ্মের রৌদ্রদগ্দ্ধ, তপ্ত, অলস ঘড়ির কাটার ক্লান্ত দুপুর। ।

জীবনের বেশ একটা বড় অংশে আমাদের রুটিনে দুপুরের একটা নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ ছিল ঘুমের জন্য। ছোটবেলায় খাওয়া দাওয়া শেষে আম্মাজান মার্শাল ল জারি করতেন- যা, ঘুমাতে যা। না ঘুমালে সন্ধ্যায় পড়তে পারবি না। তাই মার্শাল ল মাথায় নিয়ে আমরা ছোট দুই ভাইবোন চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতাম আর চীফ মার্শাল ল এডমিন্সট্রেটর হিসেবে পর্যবেক্ষণে মোতায়েন থাকতেন আম্মাজান। পত্রিকা পড়ার ফাকে ফাকে নজর দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতেন সত্যিকারের ঘুমের কতদূর। ঘুম নিয়ে এই লুকোচুরির মাঝে চোখ বন্ধ করে ঘুমের অভিনয় করতে করতে কখনো ঘুমিয়ে যেতাম আমরা আবার কখনো পর্যবেক্ষণে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যেত আম্মাজান।

কখনো কখনো ঘুমের অভিনয় করে ক্লান্ত হয়ে আম্মাজানের কাছে বলতাম- ঘুম আসে না। আম্মাজান পত্রিকা উল্টাতে উল্টাতে বলতেন- চুপ করে শুয়ে থাক, এমনিতেই ঘুম আসবে। তখন মিনমিন স্বরে আবার অনুরোধ- পেপার পড়তে দিলে হয়ত ঘুম আসতে পারে। মন ভাল থাকলে তখন বরাদ্দ হয় ইত্তেফাক বা বাংলা বাজারের খেলার পাতা আর মেজাজ খারাপ থাকলে ধমক। খেলার পাতার্যা তখন ঢাকা লীগের ৪৫ ওভারের ম্যাচ, রাণী হামিদ, নিয়াজ মোর্শেদ আর আসলাম, মোনেম মুন্নারা দাপিয়ে বেড়ায়। কোন কোন দিন সেখানে উঁকি দেয় আগাসী, সাম্প্রাস, মাইকেল চ্যাং। এর মাঝে কোন কোন দিন চোখ পিটপিট করে ছোট বোনও দাবি জানায়- ভাইয়া কে পেপার দিলে আমাকেও দিতে হবে। যদিও তখন পড়বার বয়স হয় নি তবুও পত্রিকায় তার বরাদ্দের অংশ নিয়ে বাকীদের মত গম্ভীর মুখে পাতা উল্টায় ছোটবোন।তারপর একসময় লুকোচুরি আর পত্রিকার পাতার ভীড়ে আমাদের চোখে নেমে আসে রাজ্যের যত ঘুম।

দুপুর বেলা আমাদের ঘুমের রুটিন ভংগ হত রোববার আর শুক্রবার। কারণ রোববারের কার্টুন আর শুক্রবারের তিনটা বিশের বাংলা সিনেমা। কার্টুন আমাদের দারুণ প্রিয় তবে আমাদের বেড়ে উঠা মফস্বল শহর গুলোতে তখনো ডিশের চ্যানেল গুলো জাঁকিয়ে বসে নি। তাই ডোরেমন-পোকেমন আমাদের অজানা আর তার বদলে রোববারের উডি উড প্যাকার, বৃহস্পতিবারের টম এন্ড জেরি এবং পরে হিম্যান, শুক্রবার সকালের মোগলী- গোগ্রাসে গিলি সব। কোনদিন ত্রিপিটক, কোনদিন গীতা আর কোনদিন বাইবেল পাঠ শেষে ঠিক তিনটা বিশে শুরু হয় উডি উড প্যাকার। কিন্তু মার্শাল ল অনুযায়ী আমাদের তখন ঘুমে থাকার কথা। তাই প্রতি রোববার স্কুল শেষে বাসায় এসেই আম্মাজানের সাথে দেন দরবার শুরু হয়ে যেত- প্লিজ আজকে কার্টুন দেখতে দাও। মাত্র বিশ মিনিট। এরপর ঘুমায়ে যাব। আমার সাথে সাগরেদ হিসেবে ছোটবোনও এসে ঘ্যানঘ্যান করে- আম্মু, মাত্র বিশ মিনিট। এক সময় বিরক্ত হয়ে আম্মাজান তার মোক্ষম অস্ত্র বের করেন- এসব করেই তো পড়া লেখার বারটা বাজল। গত ষান্মাসিকে কত পেয়েছিস? এরপর বেড়ালের মত আমরা মিউমিউ করি। একটু পরে যখন বুঝি অবস্থা সুবিধার না তখন আমরা একেকজন ক্ষুদে রাজনীতিবিদ হয়ে যাই। কথার ফুল ঝরাই। বার্ষিক পরীক্ষায় অবশ্যই ভাল করব। মাগরিবের আযানের আগে আগেই মাঠ থেকে বাসায় চলে আসব, সন্ধ্যায় মন দিয়ে পড়তে বসব ইত্যাদি, ইত্যাদি। ক্ষুদে রাজনীতিবিদদের এইসব রঙ্গীন আশ্বাসে মাতাজান প্রায়ই বিভ্রান্ত হন। আর আমরা মনের সুখে টিভির সামনে তিনটা বিশ থেকে তিনটা চল্লিশ বসে থাকি। মন্ত্রমুগ্দ্ধের মত আমরা তখন উডি উড পেকারের গা জ্বালানো হাসির সাথে হাসি, তার কাজকর্মে মুগ্দ্ধ হই।এভাবেই ঘুরে ঘুরে চলে যায় একেকটা রবিবার।
আমি যখন ঘড়ি দেখতে শিখি নি তখনো ঘড়িতে খালি একটা সময় ঠিক করে বলতে পারতাম- তিনটা বিশ। তিনটা বিশ বিটিভির বাংলা সিনেমার স্টার্টিং টাইম। এক সময় আমার ধারণা ছিল এভাবে তিনটা বিশ বুঝি খালি আমিই বুঝতাম কিন্তু পরে আবিষ্কার করলাম তিনটা বিশের বাংলা সিনেমা দেখে বড় হওয়া প্রজন্মের অনেকের জন্যই ঘটনাটা এক। শুক্রবার ছিল আমাদের জন্য সাপ্তাহিক ঈদের দিন। সেদিন আব্বাজান সারাদিন বাসায় থাকে, ঘুম আর পড়াশুনার বালাই নাই। তাই বিকেলে মাঠে খেলতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের সংগী তিনটা বিশের বাংলা সিনেমা। সেখানে কোন কোন দিন রাজ্জাক-কবরী, কোন দিন জসীম, ওয়াসিম, জাফর ইকবাল কিংবা মৌসুমী, অঞ্জু ঘোষ। প্রতিবারই নায়ক নায়িকার প্রেম হয়, গান হয়, ভিলেন নায়িকা কিংবা নায়কের মা কে ধরে নিয়ে যায় গারো পাহাড়। প্রতিবারই দেয়াল ভেঙ্গে, গার্মেন্টেসের খালি কার্টন বা ড্রাম উড়িয়ে হাজির হয় নায়ক আর শেষ দৃশ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া পুলিশ। তবুও আমরা মুগ্দ্ধ হই প্রতিবার। হয়ত মুগ্দ্ধ হওয়াটা খুব সহজ ছিল সেই সময়।

বাচ্চারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী এ বক্তব্যের সাথে আমি সব সময় একমত। তবে আমাদের এই অনুসন্ধিৎসু মনের প্রকাশ ঘটত দুপুর বেলা আম্মাজান ঘুমিয়ে যাওয়ার পর। কারণ যাবতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য সেই সময়টাই নিরাপদ। দুধে চিনি মিশিয়ে কীভাবে আইসক্রীম করা যায়, চুলার আগুনে লবণ ফেললে কেন কটকট শব্দ হয়, সিড়ির গোড়ায় লাল পিঁপড়াদের কলোনিতে আগুন দিলে ঠিক কী ঘটে এ জাতীয় কিছু নিরীহ ও কিছু নিষ্ঠুর কৌতুহল নিয়ে গড়ে উঠেছিল আমাদের অনুসন্ধিৎসু মন। তো একবার আম্মাজান দুপুর বেলা ঘুমিয়েৎ পড়লে শুরু হল আমার আইসক্রীম মিশন। রান্নাঘর থেকে পরিষ্কার করে ধোয়া ঔষুধের এক বোতলে চুরি করা দুধ আর তিন চার চামচ চিনি ভালভাবে মিশিয়েৎ ঝাকানোর পর বোতলটা রেখে দেওয়া হল ডিপফ্রিজে। এরপর চুপচাপ ভাল ছেলের মত এসে বিছানায় ঘুম। এর মাঝে ঘুম শেষে উঠে আম্মাজান কোন কারণে ডিপফ্রিজ খুলে আবিষ্কার করেন ঔষুধের বোতল আর তার ভিতর জমাট বাধা সাদা পদার্থ। একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর আম্মাজান বুঝতে পারেন এটা আসলে আইসক্রীম বানানোর এক অপচেষ্টা এবং প্রথম সন্দেহভাজন হিসেবে কেসে নাম আসে আমার। কারণ কয়েকদিন আগেই আমি আম্মাজান কে আইসক্রিম এর রেসিপি জিজ্ঞেস করেছিলাম। এরপর ঘুম থেকে উঠার পর আম্মাজানের জেরার মুখে কোন প্রকার রিমান্ডে নেওয়া ছাড়াই আমি স্বীকার করে নেই এই অপকর্মটা আমার। এরপর কিঞ্চিৎ উত্তম মধ্যমের পর আমাকে প্রতিজ্ঞা করানো হয় ভবিষ্যতে যেন এরকম কাজ আর না করি। তবে আম্মাজান এত বছর পরেও জানতে পারেন নাই যে এরপরেও আর দুইবার দুধ চিনি দিয়ে আমি আইসক্রীম বানানোর চেষ্টা নিয়েছি এবং চেটেপুটে পরে সমস্ত প্রমাণ বিলোপ করে দিয়েছি।

আমার দুপুর বেলার স্মৃতির আরেকটা উজ্জ্বল অংশ হল আমাদের কালো রঙের ফাইভ ব্যান্ডের ন্যাশনাল রেডিওটা। কোন এক স্টেশন থেকে বদলি হয়ে আসার সময় আব্বাজান কে ফেয়ারওয়েলে গিফট হিসেবে দেওয়া হয়েছিল এই রেডিওটা। নানাজান বেড়াতে আসলে বিবিসি বাংলা আর ভয়েজ অব আমেরিকা শোনার সময়টা ছাড়া বাকি সময় এটা ছিল আমার খেলাধূলার অংশ। বিশেষ করে তখন দুপুর দুইটার সময় ঢাকা রেডিওতে শুরু হত অনুরোধের আসর, লাক্স সুরের ধারা, মেরিল ছন্দে ছন্দে নামে একই জাতীয় কিন্তু ভিন্ন নামের অনেকগুলো অনুষ্ঠান। কেন জানি এই অনুষ্ঠান গুলো ছিল আমার প্রিয়। বেশি আকর্ষণীয় ছিল মাযহারুল ইসলামের (অথবা আনোয়ার) ভরাট গলার ঘোষণা- সুজন কি পারবে তার সাথী কে বাঁচাতে? তারা কী পারবে পরিবার আর সমাজের শত বাধা ছিন্ন করতে? হ্যাঁ ভাই, জানতে হলে দেখুন সামাজিক এ্যকশন ধর্মী রোমান্টিক সিনেমা সুজন সাথী। আর কত শত জায়গা থেকে আসা শতশত চিঠি, কত শত নাম। দিনাজপুরের বিলকিস, সিলেটের এখলাস আর বাগেরহাটের চামেলি। শুনশান দুপুরে বেতার তরঙ্গে ভেসে আসা ভরাট কন্ঠ জানিয়ে দেয়া এই সাপ্তাহে যশোরের মণিহার, সিলেটের রজনীগন্ধা, ঢাকার রাজমনিতে মহাসমারোহে চলছে কোন ছবি। চোখের সামনে ভেসে উঠে যেন সব। কী অদ্ভুত জাদু কালো বাক্সটার। শুধু শব্দ দিয়ে জীবন্ত করে তুলে সব।

দুপুর বেলা আমাদের আরেক সংগী ছিল গল্পের বই। আম্মাজান ঘুমিয়ে পড়লেই বের হয়ে আসত বালিশের নিচে লুকানো বোতল ভূত, ফেলুদা কিংবা শাহারিয়ার কবীরের অ্যাডভেঞ্চারেরা। একদিকে সতর্ক দৃষ্টি যাতে আম্মাজান জেগে গেলেও টের না পায় আর অন্যদিকে রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলা হানাবাড়ির রহস্য। সেই সময়টা যেন স্থির হয়ে যেত, অলস হয়ে যেত ঘড়ির কাঁটাটা। মাথার উপর ঘড় ঘড় করে ঘুরতে থাকা সরকারী কোয়ার্টারের ন্যাশনাল ফ্যান, বাইরে শুনশান দুপুর আর হাতে ধরা অ্যাডভেঞ্চার।ধরা পড়ার ভয় কিংবা অ্যাডভেঞ্চারের আকর্ষণ অথবা ঝিম ধরানো দুপুর, সব মিলে যেন আমাদের শৈশবের এক জাদুর জগত।

সিলেট থেকে বদলি হয়ে আসার সময় কেনা হয়েছিল এক জোড়া বেতের রকিং চেয়ার। যার একটার স্থান হয়েছিল দোতলার বারান্দায়।দুপুর বেলার রোদ সামনের কাঁঠাল গাছটার জন্য হালকা হয়ে যেত বারান্দায়। তাই দুপুর বেলা বাসার সবাই যখন ঘুমে তখন লুকিয়ে বই পড়ার জন্য সবচেয়ে ভাল জায়গা বারান্দার রকিং চেয়ারটা। একটু সময় দোল খেলেই সেখানে কেমন যেন ঝিমঝিম লাগে। সেই ঝিমঝিম চোখে সুকুমার আর তার বিড়ালের সাথে শুরু হত ভ্রমণ। কখনো পাগলা দাশু, কখনো প্রফেসর হেশোরাম হুশিয়ার আর কখনো পম্পেই এর ধ্বংসস্তূপ। পড়তে পড়তে সামনে চোখ গেলেই চোখ পড়তে মাঠের কোণায় দাঁড়ানো তাল গাছ দুইটার মাথায় বাতাসে ঝুলতে থাকা বাবুই এর বাসাগুলো। এর মাঝে কোন কোন দিন আসে সুনীলের ছুটির ঘন্টা আবার কোন দিন লুইসা মে অলকটের অনুবাদ ডানা মেলার দিন। পাগলা দাশু, মেগ,জো, বেথ, এমি অথবা বগা ভাই সবাই যেন আবার আগের মত সময়ের রাশ টেনে ধরে।

আজকে দুপুরে কোন কাজ ছাড়াই টেবিলে বসেছিলাম অনেকক্ষণ। বৃষ্টি শেষে আকাশে তখন রোদ। হাতে অফুরন্ত সময়। অলস সে সময়ে হঠাৎ যেন উঁকি দিয়ে যায় আমাদের শৈশবের দুপুর। ক্লান্ত, তপ্ত, ঝিম ধরানো দুপুর। সাথে থাকে ন্যাশনালের কালো রঙের রেডিও, বারান্দার রকিং চেয়ার, উডি উড পেকার আর আম্মার চোখ রাঙ্গানি। রূপকথার মত জীবন্ত হয়ে উঠে যেন আবার সব।স্মৃতির ঝোলায় সব রূপকথা, সব গল্প ভরে বড় হয়ে যাই আমরা। আর শৈশব, কৈশর পেছনে ফেলে বড় হয়ে যাওয়া আমাদের সব পুরাতন স্মৃতির নিশান আকড়ে আগের মত একলা দাঁড়িয়ে থাকে শুনশান দুপুর, স্মৃতির দুপুর।

Advertisements

6 thoughts on “রূপকথার দুপুর

  1. টম এন্ড জেরি দেখার স্বাদ এখনো মিটে নাই 😦

    একটা অফ টপিকঃ ভাই আপনার লিখার ফন্ট গুলা বেশ ছোট আসে । ফন্ট সাইজ টা এডিট কইরা বাড়াইয়া দ্যান । চুক্ষু যুগোল কানা হইয়া যাইতাসে 😉

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s